আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিষিদ্ধ বা ক্ষমাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রার্থিতার আইনি বৈধতার বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অবস্থান পরিষ্কার করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, নির্বাচনে রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি হিসেবে কে অংশ নিতে পারবেন আর কে পারবেন না, তা সম্পূর্ণভাবে দেশের প্রচলিত উচ্চ আদালত এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিজস্ব এখতিয়ার। দেশের বিদ্যমান এবং নতুন প্রণীত আইন পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে ইসিই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ও আইনি সিদ্ধান্ত নেবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আজ রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন কমিশন ভবনে বিএনপির সবশেষ বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবরণী আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের কাছে এই হিসাব বিবরণী হস্তান্তরকালে রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন— বিএনপির কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং দলটির সহ-দপ্তর সম্পাদক মনির হোসেন।
‘অন্য দল কী বলল, তা বিবেচ্য নয়’
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিগত ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ আইনিভাবে ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট চিঠি দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির অবস্থান জানতে চাওয়া হলে রিজভী স্পষ্ট করে বলেন, “অন্য কোনো রাজনৈতিক দল কী বলল বা কী দাবি করল, তা আমাদের এখানে বিবেচ্য বা প্রধান আলোচনার বিষয় নয়।”
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন কোনো দলীয় প্রতীকের ভিত্তিতে হচ্ছে না— এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, “আইন অনুযায়ী কারা নির্বাচনে যাওয়ার যোগ্য কিংবা অযোগ্য, তা দেখার ও যাচাই-বাছাই করার আইনি দায়িত্ব একমাত্র নির্বাচন কমিশনের। বিএনপি কোনো রাজনৈতিক চাপ না দিয়ে এই সংবেদনশীল বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে কমিশনের আইনি বিচারবুদ্ধির ওপরই ছেড়ে দিয়েছে।”
প্রতীকহীন নির্বাচন ও দলীয় কাউন্সিলের রূপরেখা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার রূপরেখা কেমন হবে কিংবা তৃণমূলের সবার জন্য প্রার্থিতা উন্মুক্ত থাকবে কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব জানান, যেহেতু এবারের নির্বাচন প্রতীকহীন (প্রতীক ছাড়া) হচ্ছে, তাই দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম (স্থায়ী কমিটি) খুব দ্রুতই এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো নীতিগত রূপরেখা চূড়ান্ত না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তা আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানানো হবে।
পাশাপাশি বিএনপির বহুল প্রতীক্ষিত আগামী জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়ে তিনি বলেন, “দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিব ইতোমধ্যে দেশব্যাপী সাংগঠনিক সম্মেলন ও কেন্দ্রীয় কাউন্সিল আয়োজনের ব্যাপারে একাধিক ফোরামে কথা বলেছেন। খুব দ্রুতই সম্মেলনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও ভেন্যু চূড়ান্ত করে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।”
জুলাই গণবিপ্লব ১৭ বছরের আন্দোলনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ
বিগত ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, “এই রক্তক্ষয়ী বিপ্লব মূলত দেশের ভূলুণ্ঠিত গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই অর্জিত হয়েছে।”
তিনি জোরালো দাবি করেন, দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃবহালের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে রাজপথের আন্দোলন চালিয়ে আসছিল, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণবিপ্লব ছিল তারই এক চূড়ান্ত ও সফল বহিঃপ্রকাশ। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসম সাহসী শিক্ষার্থী, তাদের সচেতন অভিভাবক এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এই মহান বিজয়কে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ও উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে অভিহিত করেন।
