‘যাকে আপনার পছন্দ হয় না, তাকেই ফ্যাসিস্ট বানিয়ে দেন’

“যাকে আপনার পছন্দ হয় না, তাকেই ফ্যাসিস্ট বানিয়ে দেন! মামলায় কাকে গ্রেপ্তার করব, সেটা সম্পূর্ণ আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এটা কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ না, আপনার বহু আগে আমি ঢাকায় ছাত্রদল করে আসছি”— কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই শহীদ দিবস’-এর এক সংবেদনশীল আলোচনা সভায় মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফখরুল ইসলাম মিঠুর এক ঝাঁঝালো অভিযোগের জবাবে এভাবেই অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান।

গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এই নজিরবিহীন ঘটনাটি ঘটে। গতকাল থেকে এই চাঞ্চল্যকর বাকবিতণ্ডার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা জেলাজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

হুমকি ও ‘ফ্যাসিস্ট’ ফেরা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত

প্রত্যক্ষদর্শী ও সভা সূত্রে জানা গেছে, আলোচনা সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকায় শহীদ হওয়া কুমিল্লার লাকসামের বাসিন্দা জিসানের পিতা অংশ নিয়ে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, পতিত স্বৈরাচারের দোসর স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা এখনো তাকে অনবরত হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

শহীদ পরিবারের এই আর্তনাদের সূত্র ধরে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফখরুল ইসলাম মিঠু সরাসরি কুমিল্লার পুলিশ সুপারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনি কুমিল্লায় পুলিশ সুপার হিসেবে আসার পর থেকে এখানে ফ্যাসিস্টরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ফিরে এসেছে। আপনি তাদের গ্রেপ্তার করছেন না। আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলেও পুলিশ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শহীদ জিসানের বাবাকে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।”

ছাত্রদল নেতার এমন প্রকাশ্য ও ঢালাও অভিযোগের জবাবে তাৎক্ষণিক ক্ষোভে ফেটে পড়েন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি মঞ্চ থেকে সাফ জানিয়ে দেন, “জিসান ঢাকায় নিহত হয়েছেন এবং এ ঘটনায় ঢাকাতেই নির্দিষ্ট মামলা দায়ের হয়েছে। একটি সরকারি রাষ্ট্রীয় সভায় রাজনৈতিক গৎবাঁধা বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা উচিত। এটি কোনো রাজনৈতিক দল বা অঙ্গসংগঠনের মঞ্চ নয়। সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া এভাবে ঢালাও অভিযোগ করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।”

ভিডিও ভাইরালের পর খণ্ডিত প্রচারের দাবি এসপির: সাবেক ছাত্রদল কানেকশন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর গতকাল রাতে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান দাবি করেন, সভায় তাঁর দেওয়া বক্তব্যের একটি সুনির্দিষ্ট খণ্ডিত অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “বিগত গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী বর্তমানে সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ঠিক এমন একটি সময়ে ‘জুলাই শহীদ দিবস’-এর মতো পবিত্র ও স্পর্শকাতর অনুষ্ঠানে পুলিশ প্রশাসনকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।”

উল্লেখ্য, বিগত ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর কুমিল্লার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন মো. আনিসুজ্জামান। আলোচনা সভায় নিজেকে ‘সাবেক ছাত্রদল কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করার প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি সক্রিয় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, সেটি একটি উদাহরণ বা রেফারেন্স হিসেবে আমি ওখানে বলেছি। তবে বিসিএস ক্যাডারে চাকুরিতে যোগদানের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে আমি সম্পূর্ণ পেশাদারত্বের সঙ্গেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করছি।”

পুলিশ সুপার আরও একটি বিস্ফোরক পাল্টা অভিযোগ তুলে দাবি করেন, “উক্ত ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন মামলা নিয়ে বড় ধরনের ‘মামলা-বাণিজ্যের’ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আমি কুমিল্লায় যোগদানের পর এই অবৈধ মামলা-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির সুযোগ কঠোরভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই নেতা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে এমন ঢালাও ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন।”

অভিযোগ অস্বীকার ছাত্রদল নেতার

পুলিশ সুপারের এমন পাল্টা ‘মামলা-বাণিজ্যের’ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদল নেতা ফখরুল ইসলাম মিঠু। তিনি দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে বলেন, “পুলিশ সুপারের এই পাল্টা অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। আমার বিরুদ্ধে মামলা-বাণিজ্যের এমন কোনো সত্য প্রমাণ বা উপাদান থাকলে তিনি পুলিশ সুপার হিসেবে অনেক আগেই আমার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারতেন। মূলত নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই তিনি এই পাল্টা অভিযোগ করছেন।”

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত হাই-প্রোফাইল স্মরণ সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন— কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ, আহত ব্যক্তিবর্গ এবং জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। শহীদ দিবসের মতো মঞ্চে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতার এমন বাদানুবাদ দীর্ঘক্ষণ সভাকক্ষে এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *