যশোরের অভয়নগর উপজেলায় এক কিশোরী (১৬) পোশাক শ্রমিককে গভীর রাতে আটকে রেখে গণ-সহযোগিতায় ধর্ষণ এবং প্রেমিককে মারধর করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে উপজেলার শ্রীধরপুর ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলামের দোকানের পাশে এই পৈশাচিক অপরাধ সংঘটিত হয়। ভুক্তভোগী ওই কিশোরী স্থানীয় একটি জুট মিলের শ্রমিক হিসেবে কর্মরত।
এই নৃশংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) রাতে ভুক্তভোগীর প্রেমিক ও পেশায় ইজিবাইক চালক লিমন হাওলাদার বাদী হয়ে অভয়নগর থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২ থেকে ৩ জনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং চাঁদাবাজির ধারায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশি তৎপরতায় এজাহারনামীয় প্রধান ৬ আসামিকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অবরুদ্ধ করে মারধর ও চাঁদা দাবি
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মামলার বাদী ইজিবাইক চালক লিমন হাওলাদারের সঙ্গে ওই কিশোরী মিল শ্রমিকের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতে লিমন তার ইজিবাইকে করে ওই কিশোরীকে নিয়ে শংকরপাশা গ্রাম সংলগ্ন এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিলেন। রাত বাড়লে একপর্যায়ে স্থানীয় বখাটে ও চিহ্নিত অপরাধী চক্রের সদস্য আরজান গাজীসহ এজাহারনামীয় ৬ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন তাদের গতিপথ রোধ করে ইজিবাইকটি থামায়।
আসামিরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই চালক লিমনকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে গুরুতর জখম করে এবং তার প্রেমিকা ও জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম ইজিবাইকটি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। এরপর আসামিরা লিমনকে আটকে রেখে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া ও তাদের ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে নগদ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে।
গভীর রাতে বর্বরতা
টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে এবং গভীর রাতের নীরবতার সুযোগ নিয়ে আসামিরা রাত ২টার দিকে শংকরপাশা গ্রামের মনিরুল ইসলামের দোকানের পাশে একটি অন্ধকার নির্জন স্থানে ভুক্তভোগী কিশোরীকে নিয়ে যায়। সেখানে অন্যান্য আসামিদের প্রত্যক্ষ শারীরিক সহযোগিতা ও পাহারায় প্রধান অভিযুক্ত আরজান গাজী ওই কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এ সময় কিশোরীর চিৎকারে আশেপাশের লোকজন টের পাওয়ার আগেই আসামিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
মামলার বাদী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী লিমন হাওলাদার বলেন, “আমরা কোনো অপরাধ করিনি। তারা আমাদের অন্যায়ভাবে অবরুদ্ধ করে টাকা দাবি করে এবং আমার চোখের সামনে এই পৈশাচিক বর্বরতা চালায়। আমি দেশের প্রচলিত আইনের ওপর আস্থা রেখে অভয়নগর থানায় মামলা করেছি এবং আসামিদের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবি জানাচ্ছি।”
পুলিশি অভিযানে এজাহারনামীয় সবাই গ্রেপ্তার
লোমহর্ষক এই ঘটনার বিবরণ পেয়ে অভয়নগর থানা পুলিশ দ্রুত অ্যাকশনে নামে। থানা সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এজাহারনামীয় গ্রেপ্তারকৃত ৬ আসামি হলেন—
১. উপজেলার শ্রীধরপুর ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মোশারফ গাজীর ছেলে আরজান গাজী (৩০),
২. একই গ্রামের আব্দুর রহিম মোড়লের ছেলে হাসান মোড়ল (৩৮),
৩. মৃত বাকি সরদারের ছেলে সাজ্জাদ সরদার (৩৮),
৪. নূর মোহাম্মদ ওরফে আপন খানের ছেলে সাজিদ হোসেন (২৪),
৫. মৃত আমজেদ গাজীর ছেলে মামুন গাজী ওরফে ভুট্টো গাজী (৪১) এবং
৬. মৃত সাত্তার মোল্যার ছেলে শফিক মোল্যা (৪৪)।
মামলা ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়ে অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, “কিশোরীকে ধর্ষণ ও চাঁদা দাবির অভিযোগ পাওয়ার পরপরই মামলাটি নথিবদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের চৌকস টিম তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় চিহ্নিত ৬ আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ভুক্তভোগী কিশোরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকি অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশি চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।” এই ঘটনায় শংকরপাশা গ্রামসহ স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও আসামিদের দ্রুত ফাঁসির দাবি জানানো হয়েছে।
