স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত ও সফল উত্তরণের (Graduation) প্রস্তুতিমূলক সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর জোর অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশের একটি মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক অংশীজনদের আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারের লক্ষ্যে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC)-এর সভাপতি ও সহ-সভাপতির সঙ্গে পৃথক দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
আজ শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ও জনসংযোগ শাখা থেকে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদরদপ্তরে এই পৃথক বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ইকোসকের বর্তমান সভাপতি ও নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লোক বাহাদুর থাপা এবং ইকোসকের সহ-সভাপতি ও আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আমর বেনজামার কাছে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর পক্ষে সরকারের জোরালো ও বাস্তবসম্মত যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
অন্তরায় বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও জলবায়ু পরিবর্তন: বাণিজ্যমন্ত্রী
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলেন, “বাংলাদেশের চলমান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা, তীব্র জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (Supply Chain) উপর্যুপরি বিঘ্ন, জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব এবং অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক বহিঃপ্রতিকূলতার কারণে বাংলাদেশ পূর্বনির্ধারিত প্রস্তুতিকালের পূর্ণ সুফল বা কাঙ্ক্ষিত সুবিধাগুলো পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি।”
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে মর্যাদাশীল উত্তরণে সামগ্রিকভাবে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের এই প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের মূল উদ্দেশ্য উত্তরণ প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই বিলম্বিত করা নয়; বরং দেশের ব্যাপক কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার সুসংহত করা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন জোরদার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দেশের ভঙ্গুর আর্থিক খাতকে শক্তিশালীকরণ, বিদেশী বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন এবং একটি সুদূরপ্রসারী ও টেকসই মসৃণ উত্তরণ কৌশল (Smooth Transition Strategy) বাস্তবায়নের মাধ্যমে চূড়ান্ত গ্র্যাজুয়েশনকে টেকসই ও স্থিতিশীল করা।”
নিবিড়ভাবে কাজ করার প্রত্যয় ইকোসক নেতৃত্বের
বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর উত্থাপিত যৌক্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও প্রস্তাবের পর ইকোসকের সভাপতি লোক বাহাদুর থাপা এবং সহ-সভাপতি আমর বেনজামা এলডিসি থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে বিদ্যমান বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়ে একমত পোষণ করেন। তাঁরা বৈশ্বিক মন্দা ও জলবায়ু সংকটের মাঝে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের এলডিসি থেকে একটি মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট উইংগুলোর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘের এই অতি-গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বৈঠকে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। প্রতিনিধিদলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন— প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী।
ব্যবসায়ী ও উৎপাদন খাতের অংশীজন হিসেবে বেসরকারি পর্যায় থেকে আরও উপস্থিত ছিলেন— লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (LFMEAB)-এর সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BGMEA) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও শিল্প খাতের সুরক্ষায় এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
