জরুরি চিকিৎসাসেবায় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সময়মতো সঠিক অ্যাম্বুল্যান্স খুঁজে পাওয়া। এই জটিল ও সংবেদনশীল সমস্যার সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও আধুনিক সমাধান নিয়ে এসেছেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার তরুণ আইটি উদ্যোক্তা ধিলন রায়। ব্যবহারকারীর বর্তমান অবস্থান বা লাইভ লোকেশন ট্র্যাক করে তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা অ্যাম্বুল্যান্স শনাক্ত এবং দ্রুত বুকিংয়ের সুবিধা সংবলিত তাঁর উদ্ভাবিত ডিজিটাল অ্যাপ ‘নিওসেভার’ (NeoSaver) স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশের জাতীয় পর্যায়ে অনন্য স্বীকৃতি লাভ করেছে।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় সারা দেশের প্রায় ৩০০টি উদ্ভাবনী প্রজেক্টের মধ্যে একাধিক কঠোর ধাপে মূল্যায়ন শেষে দেশসেরা শীর্ষ তিনটি উদ্যোগের একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে ‘নিওসেভার’। এই অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অংশ হিসেবে স্টার্টআপটিকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকার ‘সিড ফান্ড’ (Seed Fund) প্রদান করা হয়েছে।
আজ শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) বেলা ১১টার দিকে বাগেরহাটের চিতলমারীর নিজ বাড়িতে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ‘নিওসেভার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ধিলন রায় তাঁর এই যুগান্তকারী উদ্ভাবন, গবেষণা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
ফোনকলের ভোগান্তি এড়িয়ে মাত্র ৩ ধাপে মিলবে অ্যাম্বুল্যান্স
ডিজিটাল এই অ্যাপটির প্রয়োজনীয়তা ও প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে ধিলন রায় বলেন, “বর্তমানে আমাদের দেশে অধিকাংশ অ্যাম্বুল্যান্স সেবা পুরোপুরি ফোনকল এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে জরুরি মুহূর্তে মুমূর্ষু রোগীর স্বজনদের বিভিন্ন নম্বরে হন্যে হয়ে ফোন করে অ্যাম্বুল্যান্স খুঁজতে হয়। অনেক সময় চালকদের সাথে দরদাম করতে কিংবা সঠিক সময়ে সাড়া না পাওয়ায় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, যা রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। এই রূঢ় ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই আমি একটি সমন্বিত ও তাৎক্ষণিক ডিজিটাল প্ল্যাটফরম তৈরির চিন্তা শুরু করি।”
তিনি জানান, ‘নিওসেভার’ অ্যাপটি ব্যবহার করে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে একজন সাধারণ মানুষও মাত্র ৩টি অত্যন্ত সহজ ধাপে অ্যাম্বুল্যান্স বুক করতে পারবেন: ১. লোকেশন নির্বাচন: প্রথমে ব্যবহারকারী অ্যাপে প্রবেশ করে নিজের বর্তমান অবস্থান (লাইভ লোকেশন) যুক্ত করবেন। ২. গন্তব্য নির্ধারণ: এরপর রোগী কোন হাসপাতালে বা কোথায় যাবেন, সেই গন্তব্যটি নির্ধারণ করবেন। ৩. বুকিং নিশ্চিতকরণ: সবশেষে বুকিং কনফার্ম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জিপিএস (GPS) প্রযুক্তির মাধ্যমে নিকটবর্তী অ্যাম্বুল্যান্সচালকের স্মার্টফোনে রিকোয়েস্ট পৌঁছে যাবে এবং চালক দ্রুত রোগীর ঠিকানায় চলে আসবেন।
ধিলন রায়ের ভাষ্যমতে, অ্যাপের ইন্টারফেসটি এতটাই সহজ ও ব্যবহারকারী-বান্ধব (User-friendly) করে তৈরি করা হয়েছে, যাতে যেকোনো জরুরি বা আতঙ্কের পরিস্থিতিতেও সাধারণ মানুষ কোনো জটিলতা ছাড়াই এটি দ্রুত ব্যবহার করতে পারেন। ধীরে ধীরে দেশের প্রতিটি প্রান্তের চালক ও অ্যাম্বুল্যান্স সেবাদাতা সংস্থাকে এই কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফরমে যুক্ত করা হচ্ছে।
সিএসই স্নাতক ধিলনের হাত ধরে যেভাবে শুরু ‘নিওসেভার’
অদম্য মেধাবী তরুণ ধিলন রায় বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারি দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা ধনঞ্জয় রায় এবং মা মীরা রানী বাড়ৈ। ধিলন খুলনা নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। মূলত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব’ কর্মসূচির আওতাধীন বিশেষ মেন্টরশিপের মাধ্যমেই ‘নিওসেভার’-এর আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।
শুরুতে মাত্র পাঁচজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে এই প্রজেক্টের কাজ শুরু হলেও, বর্তমানে দেশের শতাধিক তরুণ ও মেধাবী সদস্যের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে স্টার্টআপটি। এই দক্ষ দলে দেশের বিভিন্ন নামী সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি শিক্ষার্থী, মেডিক্যাল ও নার্সিংয়ের শিক্ষার্থী এবং স্বাস্থ্য খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবীরা ভলান্টিয়ার ও টেকনিক্যাল পার্টনার হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় অ্যাম্বুল্যান্স মালিক এবং চালক সংগঠনের সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করে সেবার পরিধি দেশব্যাপী দ্রুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৩০০ প্রজেক্টকে পেছনে ফেলে জাতীয় মঞ্চে বাজিমাত
ধিলন রায় অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানান, গত ১৪ জুলাই (২০২৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এক লাখ টাকার ‘সিড ফান্ড’ এবং জাতীয় সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, “সারা দেশ থেকে প্রায় ৩০০টি আইটি ও উদ্ভাবনী স্টার্টআপ এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। সেখানে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং একাধিক টেকনিক্যাল রাউন্ডের চুলচেরা মূল্যায়নের পর আমাদের ‘নিওসেভার’ শীর্ষ তিনে জায়গা করে নিয়েছে। এই রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বীকৃতি আমাদের পুরো টিমের কাজের প্রতি গভীর আত্মবিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই সেবা সম্প্রসারণে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।”
ব্যক্তিগত জীবনের একটি বাস্তব ও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এই সংকটের ডিজিটাল সমাধান খুঁজতে গিয়েই মূলত ‘নিওসেভার’-এর ধারণার জন্ম হয়েছিল বলে জানান ধিলন। বর্তমানে এটি একটি সরকার-স্বীকৃত সম্ভাবনাময় স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি (Health-Tech) স্টার্টআপে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে বাংলাদেশের সামগ্রিক জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও স্মার্ট লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর, সমন্বিত এবং শতভাগ জনবান্ধব প্ল্যাটফরম হিসেবে গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য নিয়ে ধিলন রায়ের ‘নিওসেভার’ টিম ধাবমান।
