ভয়াবহ বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশের সামগ্রিক উপকূলীয় এলাকাকে আরও সুরক্ষিত ও নিরাপদ করতে অত্যন্ত টেকসই এবং শক্তিশালী স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের মেগা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। আজ শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) দুপুরে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বন্যাকবলিত ও ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের সময় এক জরুরি মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশনের পথকে মসৃণ করতে যেসব খালের মুখ বর্তমানে বন্ধ বা ভরাট হয়ে রয়েছে, সেখানে নতুন করে আধুনিক স্লুইস গেট (Sluice Gate) নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে বর্ষা বা বন্যার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী প্লাবনের পানি সহজে ও দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে। পর্যটন নগরী কক্সবাজারসহ দেশের বন্যা ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন জেলা ও জনপদে ইতিমধ্যে এই ধরনের আধুনিক অবকঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও উল্লেখ করেন, ভৌগোলিক কারণে পানি ও মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততা, উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দীর্ঘ সময়ের অবক্ষয়জনিত প্রভাবে উপকূলের অনেক বেড়িবাঁধ ও স্লুইস গেট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাতীয় স্বার্থে এসব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব নির্ধারিত পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগসমূহ নিয়মিতভাবে ও আন্তরিকতার সাথে পালন করে থাকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নয়, স্লুইস গেটের ব্যবস্থাপনায় নতুন নির্দেশনা
স্লুইস গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন ও লবণাক্ত পানি প্রবেশ রোধে মাঠপর্যায়ের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করতে সরকারের একটি বড় ও যুগান্তকারী নীতিগত পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, এ বিষয়ে সরকার ইতিমধ্যেই একটি নতুন ও বিশেষ প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করেছে।
নতুন এই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) স্লুইস গেটের দৈনন্দিন তদারকি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আর থাকবে না। এর পরিবর্তে মাঠপর্যায়ে সরাসরি স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ওপর এই দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই সিদ্ধান্তের সুফল ব্যাখ্যা করে বলেন, “এই বিকেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে যখনই বন্যার পানি জমবে, তখনই তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনের সময় স্লুইস গেট খুলে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা যাবে। আবার জোয়ারের সময় বা শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী গেট বন্ধ রেখে লোকালয়ে ক্ষতিকর লবণাক্ত পানি প্রবেশ রোধ করা আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও দ্রুততর হবে। এর ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে, স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে এবং স্লুইস গেটের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা আরও গণমুখী ও কার্যকর হয়ে উঠবে।”
১০০টি ঘর নির্মাণ কার্যক্রমের রাজকীয় উদ্বোধন ও ত্রাণ বিতরণ
বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনের আগে আজ সকাল সাড়ে ১১টায় পেকুয়া উপজেলা মাঠে এক মানবিক ও পুর্নবাসন কর্মসূচিতে অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে প্রখ্যাত দাতব্য সংস্থা ‘শামসুল হক ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে সাম্প্রতিক বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো ও ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ‘১০০টি টেকসই ঘর’ নির্মাণ কার্যক্রমের ফলক উন্মোচন ও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
উল্লেখ্য, দুই দিনের সরকারি সফরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল শুক্রবার (১৭ জুলাই) কক্সবাজারে আসেন। সফরের প্রথম দিন তিনি চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন বন্যা কবলিত দুর্গম এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে বন্যার্ত ও পানিবন্দি হাজারো মানুষের মাঝে জরুরি খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থসহ ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। মন্ত্রীর এই ঝটিকা সফরে স্থানীয় প্রশাসন ও বানভাসি মানুষের মনে নতুন আশার আলো সঞ্চার হয়েছে।
