চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে মাঠের ফুটবলে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার দাপট ও নান্দনিকতা যেমন ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি রেফারিদের কাছ থেকে আলবিসেলেস্তেদের ‘বিশেষ সুবিধা’ পাওয়ার গুরুতর অভিযোগ ঘিরে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক ও সমালোচনাও কম হয়নি। বিশেষ করে শেষ ষোলোর নকআউট ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পর মিসরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান এবং তারকা ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকো ম্যাচ রেফারিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই পক্ষপাতিত্বের তির ছুড়েছিলেন।
এমনকি বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (EFA) বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার (FIFA) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত নালিশও জানায়। সেই উত্তপ্ত বিতর্কের রেশ ধরেই হয়তো এবার মেগা ফাইনালের আগে রেফারিংয়ের মান ও নিরপেক্ষতা নিয়ে ম্যাচ অফিসিয়ালদের আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে রাখলেন স্পেনের মাস্টারমাইন্ড কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
আগামী রবিবার (১৯ জুলাই ২০২৬) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের চূড়ান্ত মহালড়াইয়ে নামছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। ফুটবল বিশ্বের চোখ ধাঁধানো এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি পরিচালনার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্লোভেনিয়ান অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিচকে (Slavko Vinčić)। আর এই রেফারিকে ঘিরেই স্প্যানিশ কোচের সাফ কথা—ম্যাচে ফুটবলের নিয়মের কঠোরতম প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
নিয়মের সীমারেখা অতিক্রম করা যাবে না: ফুয়েন্তে
স্প্যানিশ নামী ক্রীড়া দৈনিক ‘স্পোর্ত’ (Sport)-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে রেফারিং প্রসঙ্গে বলেন, “বিশ্বকাপের ফাইনালের মতো এত বড় একটি মঞ্চে রেফারি কোনোভাবেই মাঠে শিথিলতা দেখাতে পারেন না কিংবা কাউকে নিয়ম ভাঙার প্রচ্ছন্ন সুযোগ দিতে পারেন না। ফুটবলের বৈধতার যে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি সীমারেখা আছে, মাঠে তা কোনোভাবেই কোনো দলের স্বার্থে অতিক্রম করা উচিত নয়।”
তবে রেফারিদের প্রতি নিজের পেশাদার আস্থার কথাও জানাতে ভুলেননি স্পেনের এই ইউরোজয়ী গুরু। তিনি যোগ করেন, “ম্যাচ অফিসিয়াল ও রেফারিদের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। একই সঙ্গে আমাদের ফুটবলারদেরও পরিষ্কারভাবে জানা আছে যে, এমন একটি বিশ্ব কাঁপানো ফাইনালে কীভাবে স্নায়ু ধরে রেখে মাঠের ভেতরে খেলতে হয়।”
স্কালোনির ‘শিক্ষক’ যখন প্রতিপক্ষ
একটি মজার ঐতিহাসিক তথ্য হলো, আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের বর্তমান মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনির ফুটবল কোচিং কোর্সের প্রধান প্রশিক্ষক বা শিক্ষক ছিলেন এই লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ফাইনালের ডাগআউটে নিজের সেই পুরনো ছাত্রের মুখোমুখি হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে স্প্যানিশ কোচ জানান, ফাইনালে আর্জেন্টিনার রণকৌশল যা-ই হোক না কেন, স্পেনের একমাত্র মূল লক্ষ্য থাকবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের চেনা ও আক্রমণাত্মক ছন্দে খেলা।
তিনি বলেন, “আর্জেন্টিনা ফাইনালে তাদের নিজস্ব ঘরানায় ও আগ্রাসী ফুটবল খেলবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনোযোগ ও ফোকাস থাকবে শুধু আমাদের নিজেদের স্বাভাবিক খেলায়। নিজেদের ফুটবল দর্শনকে আরো শক্তিশালী করা এবং মাঠের ভেতরে সেটিকে আরো নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন স্পেনের প্রধান লক্ষ্য।”
একই সঙ্গে স্প্যানিশ ফুটবলারদের মাঠের ভেতরের যেকোনো ধরনের উসকানি এড়িয়ে চলার কঠোর পরামর্শ দিয়ে গুরু ফুয়েন্তে বলেন, “আমরা যদি আমাদের ফুটবল দর্শন ও খেলার মূল ধরন থেকে একচুলও বিচ্যুত হই, তবে ফাইনালে আমাদের চড়া মূল্য ভোগ করতে হবে। আমরা ফুটবলটা ফুটবলের মতোই শৈল্পিকভাবে খেলতে পছন্দ করি। নিজেদের ভাবনায় অটল থাকতে চাই, মাঠের কোনো ধরনের উসকানিতে পা দিতে চাই না। অবশ্য এর মানে এই নয় যে আর্জেন্টিনা আমাদের উসকানি দেবে বা তেমন কিছু করবে।” মাঠের লড়াই শুরুর আগেই দুই কোচের এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
