‘মৃত্যুর পর আমার লাশ যেন এফডিসিতে নেওয়া না হয়’: ক্ষোভ ও অভিমানে চিত্রনায়িকা রোজিনা

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতা, নোংরামি ও চলমান বিতর্কের মধ্যে এবার চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের নন্দিত ও সোনালী যুগের অন্যতম শীর্ষ চিত্রনায়িকা রোজিনা। গত রবিবার (৫ জুলাই, ২০২৬) রাজধানীর উত্তরার নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিল্পী সমিতির নির্বাচন এবং এফডিসির বর্তমান পরিবেশ নিয়ে নিজের পুঞ্জীভূত কষ্ট ও ক্ষোভের কথা গণমাধ্যমকে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে রোজিনা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বর্তমান এফডিসির পরিবেশ এতটাই কলুষিত হয়েছে যে, তিনি বেঁচে থাকতে তো দূর, মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মরদেহ বা লাশ যেন কোনো অবস্থাতেই এফডিসিতে না নেওয়া হয়। তাঁর এমন বিস্ফোরক মন্তব্যের পর ঢালিউড পাড়াসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

‘নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ ছিল না, এফডিসি তার ঐতিহ্য হারিয়েছে’

সংবাদ সম্মেলনে রোজিনা অভিযোগ করে বলেন, এবারের চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে কোনো সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ ছিল না। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত নানারকম অসংগতি ও অনিয়ম তাঁর চোখে পড়েছে।

বিগত কয়েক দশকের এফডিসির সোনালী ইতিহাসের সাক্ষী এই অভিনেত্রী বর্তমানের পরিবেশ নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “এফডিসি এখন আর আমাদের আগের সেই এফডিসি নেই। এখানে পারস্পরিক সম্মান, পেশাদারিত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধের সবকিছুই একে একে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বেঁচে থাকতে জীবনে কোনোদিন আমি আর শিল্পী সমিতিতে যাবো কি না, তা আমার জানা নেই। তবে আমি আমার পরিবারকে শক্তভাবে বলে দিয়েছি—আমার মৃত্যুর পর যেন ভুল করেও আমার লাশ এফডিসিতে নেওয়া না হয়।”

তিনি যোগ করেন, তাঁর এই সিদ্ধান্ত কোনো সাময়িক আক্ষেপ বা ক্ষণস্থায়ী রাগ থেকে নেওয়া নয়; বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কষ্ট ও এফডিসির বর্তমান অসংগতিগুলো চোখের সামনে দেখার পর তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “এখনকার চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষগুলোর মধ্যে সিনিয়র শিল্পীদের সম্মান বা শ্রদ্ধা করার মতো মানসিকতা একেবারেই উঠে গেছে।”

নায়করাজ রাজ্জাকের স্মৃতিচারণ ও চক্রান্তের অভিযোগ

নিজের এই চরম সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি দিতে গিয়ে রোজিনা ঢালিউডের প্রয়াত ‘নায়করাজ’ রাজ্জাকের একটি অতীত ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, “রাজ্জাক ভাইও তাঁর জীবনের শেষ সময়ে গভীর অভিমানে এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যেন তাঁকে এফডিসিতে নেওয়া না হয়। আজ বর্তমান চলচ্চিত্রের নোংরা পরিবেশ এবং মানুষের আমূল বদলে যাওয়া স্বভাব দেখে আমি বুঝতে পারছি কেন তিনি সেই কথা বলেছিলেন। আমি অনেক আগে থেকেই আমার পরিবার ও সন্তানদের এই বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে রেখেছি।”

শিল্পী সমিতির এই নির্বাচনে নিজের পরাজিত হওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে রোজিনা স্পষ্ট করে বলেন, “আমি চক্রান্তের শিকার হয়ে হেরে গেছি বলেই আজ ক্ষোভে এই কথাগুলো বলছি—বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। নির্বাচনে জেতা-হারা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। এফডিসিতে পা না রাখার এই সিদ্ধান্ত আমি নির্বাচন হওয়ার অনেক আগে থেকেই মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম এবং আমার পরিবারের সাথেও এ বিষয়ে আগেই আলোচনা হয়েছিল।”

শুধু সরকারি কাজে অংশ নেবেন, সাধারণ প্রয়োজনে নয়

চলচ্চিত্র এবং শিল্পী সমিতি নিয়ে মনে প্রচণ্ড তিক্ততা জমলেও, রোজিনা জানান যে তিনি চলচ্চিত্র পুরোপুরি ছেড়ে দিচ্ছেন না। রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান কিংবা প্রযোজক সমিতির সদস্য হিসেবে কোনো সাংগঠনিক ও বিশেষ প্রয়োজনে ডাক পড়লে তিনি অংশ নেবেন। তবে সাধারণ কোনো কাজের জন্য বা আড্ডা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এফডিসির মাটিতে আর পা রাখার কোনো ইচ্ছে তাঁর নেই।

উল্লেখ্য, এবারের শিল্পী সমিতির নির্বাচন নিয়ে রোজিনা ছাড়াও একাধিক তারকা ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ইতিমধ্যেই প্রকাশ্য অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশন বা নবনির্বাচিত শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রোজিনার এই আবেগঘন ও ক্ষুব্ধ মন্তব্য প্রকাশের পর চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্য সিনিয়র শিল্পী ও সাধারণ ভক্তদের মাঝে বর্তমান চলচ্চিত্র সংস্কৃতির অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সিনেমাপাড়ার এমন সব চাঞ্চল্যকর খবর, তারকাদের অন্দরের কথা এবং বিনোদন জগতের সব সর্বশেষ আপডেট সবার আগে জানতে নিয়মিত চোখ রাখুন ‘দৈনিক রিপোর্টার বিডি’-এর বিনোদন পাতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *