রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ পাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট। ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থন জোরদার এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে শুক্রবার (৮ আগস্ট) বিলটি সিনেটে পাস হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সিনেটে বিলটির পক্ষে ৮৬ জন এবং বিপক্ষে ১১ জন সিনেটর ভোট দিয়েছেন। তবে সিনেটে পাস হলেও নিষেধাজ্ঞাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না। বিলটি এখন প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়ার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন ও স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
নতুন এই নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের অন্যতম লক্ষ্য রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপে ফেলা এবং দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করা। বিশেষ করে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের উৎস জ্বালানি খাতকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার পাশাপাশি দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
ইরানের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব
নতুন আইনে ইরানের ওপর বিদ্যমান কিছু নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এ বিধান কার্যকর করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিলটির প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদনের পর এটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রুশ জ্বালানি খাতকে টার্গেট
নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়ার জ্বালানি খাত। ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে পাওয়া রাজস্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই এই খাতকে লক্ষ্য করে নতুন চাপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিল অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোকেও পরোক্ষভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানির শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
এর ফলে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা
নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে রাশিয়ার কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের আওতায় এমন কিছু তেলবাহী জাহাজ রয়েছে, যেগুলোর মালিকানা কাঠামো অস্পষ্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত বিমা ব্যবস্থার বাইরে থেকে পরিচালিত হয়।
রুশ তেল পরিবহনে এই জাহাজগুলোকে সহায়তা করা দেশ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে জানা গেছে।
তবে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে’ প্রয়োজনীয় মনে করলে প্রেসিডেন্ট চাইলে কোনো দেশ, কর্মকর্তা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে অব্যাহতি দিতে পারবেন।
দ্বিদলীয় সমর্থনে বিল পাস
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ইউক্রেনকে সহায়তা ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিভিন্ন ইস্যুতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে। তবে নতুন নিষেধাজ্ঞা বিলটি সিনেটে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী দ্বিদলীয় সমর্থন পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে বিলটি যৌথভাবে উত্থাপন করেছিলেন দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল।
তবে সে সময় হোয়াইট হাউসের আপত্তির কারণে বিলটি এগোয়নি। ওই সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করছিলেন। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে বিলটির বিরোধিতা করা হয়েছিল।
জেলেনস্কির তৎপরতার পর গতি
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সাম্প্রতিক তীব্রতার মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজটি নতুন করে গতি পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে অংশ নিতে গিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সেখানে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ইউক্রেনকে সহায়তা এবং রুশ সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেন।
এদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতাও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কিয়েভে রুশ হামলায় হতাহতের খবরের পাশাপাশি ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের হামলা
অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার ভূখণ্ডের ভেতরে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইউক্রেনীয় হামলার কথা উঠে এসেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও রাশিয়ার ভূখণ্ডের কয়েক শ মাইল ভেতরে থাকা দুটি তেল শোধনাগারে হামলার কথা জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে যুদ্ধের পাল্টাপাল্টি হামলা আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন সিনেটরদের উদ্বেগ
বিলটি ব্যাপক সমর্থন পেলেও এর কিছু বিধান নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, নতুন আইনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে ব্যাপক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা চলে আসতে পারে। এর ফলে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর রাফায়েল ওয়ার্নক প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্যে একটি সংশোধনী আনার চেষ্টা করেছিলেন। তবে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের কাছ থেকে কংগ্রেস নির্ধারিত সীমার মধ্যে ক্ষমতা ব্যবহারের আশ্বাস পাওয়ার পর তিনি সেই উদ্যোগ প্রত্যাহার করেন।
শেষ পর্যন্ত ওয়ার্নকসহ অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট সিনেটর বিলটির পক্ষে ভোট দেন। তবে ১০ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল বিলটির বিরোধিতা করেন।
পুতিনের জন্য কঠোর বার্তা
বিলটির সমর্থকদের মতে, সিনেটে বিপুল ভোটে পাস হওয়া নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ রাশিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি ইউক্রেনের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনেরও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
তবে বিলটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করতে এখনো প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে রাশিয়ার জ্বালানি খাত, তেল বাণিজ্য এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা বিভিন্ন পক্ষের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ আরও বাড়তে পারে।
