বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়ে বদলে গেছে ভাগ্য, বড় ক্লাবে জায়গা পাওয়া তারকাদের তালিকায় ভোজিনহা

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু বিশ্বসেরা দল নির্ধারণের মঞ্চই নয়, এটি অসংখ্য ফুটবলারের ক্যারিয়ার বদলে দেওয়ারও এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম। প্রতি আসরেই এমন কিছু খেলোয়াড় নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে আসেন, যাদের দিকে নজর পড়ে ইউরোপ ও বিশ্বের শীর্ষ ক্লাবগুলোর। বিশ্বকাপে আলো ছড়ানোর পর অনেক ফুটবলারের ক্যারিয়ার নতুন মোড় নিয়েছে, বদলে গেছে তাদের ক্লাব, জনপ্রিয়তা এবং পেশাদার জীবনের গতিপথ।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে তুলনামূলক ছোট ক্লাব বা কম পরিচিত লিগে খেলা ফুটবলাররা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করে বিশ্বের সেরা ক্লাবগুলোর জার্সি গায়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের গল্প আজও ফুটবলপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে।

মার্ক-ভিভিয়েন ফো: বিশ্বকাপ থেকে ফরাসি লিগে উত্থান

ক্যামেরুনের কিংবদন্তি মিডফিল্ডার মার্ক-ভিভিয়েন ফো ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে নিজের শক্তিশালী ও পরিণত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি ইউরোপীয় স্কাউটদের নজর কাড়েন।

বিশ্বকাপ শেষে ক্যামেরুনের ক্লাব ক্যানন ইয়াউন্ডে ছেড়ে ফ্রান্সের লেন্সে যোগ দেন তিনি। পরবর্তীতে লেন্সের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে ক্লাবটির প্রথম ফরাসি লিগ শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

গিলবার্তো সিলভা: ব্রাজিলের বিশ্বজয় থেকে আর্সেনালের ‘ইনভিন্সিবল’

২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন গিলবার্তো সিলভা। অধিনায়ক এমারসন ইনজুরিতে ছিটকে পড়ায় শুরুর একাদশে সুযোগ পান তিনি এবং পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।

বিশ্বকাপ শেষে ব্রাজিলের অ্যাতলেটিকো মিনেইরো থেকে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালে যোগ দেন। কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের অধীনে আর্সেনালের ইতিহাসখ্যাত ‘ইনভিন্সিবলস’ দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হন তিনি। ছয় বছরের ক্যারিয়ারে দুটি এফএ কাপসহ একাধিক শিরোপা জেতেন এই ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার।

হাভিয়ের মাসচেরানো: বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠা

২০০৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শন করে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নজরে আসেন হাভিয়ের মাসচেরানো। বিশ্বকাপের পর তিনি ওয়েস্ট হ্যামে যোগ দিলেও সেখানে দীর্ঘদিন থাকেননি।

পরবর্তীতে লিভারপুলে যোগ দিয়ে ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারে পরিণত হন। পরে বার্সেলোনায় গিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগাসহ অসংখ্য বড় শিরোপা জিতে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

মেসুত ওজিল: বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়ে রিয়াল মাদ্রিদে

২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেন মেসুত ওজিল। পুরো টুর্নামেন্টে চারটি অ্যাসিস্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ গোল করে তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলার হিসেবে পরিচিতি পান।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ভের্ডার ব্রেমেন থেকে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। সেখানে তিন মৌসুম খেলার পর ইংলিশ ক্লাব আর্সেনালে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে যোগ দিয়ে ক্লাবটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন।

হামেস রদ্রিগেজ: গোল্ডেন বুট থেকে রিয়াল মাদ্রিদ

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হয়ে ছয় গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন হামেস রদ্রিগেজ। উরুগুয়ের বিপক্ষে করা তার অসাধারণ ভলি গোলটি পরে ফিফার পুসকাস অ্যাওয়ার্ডও জিতে নেয়।

বিশ্বকাপের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ফরাসি ক্লাব মোনাকো থেকে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে দলে ভিড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ। স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা জয় করেন।

বিশ্বকাপ বদলে দেয় ফুটবলারের ভবিষ্যৎ

বিশ্বকাপের মঞ্চে সফলতার পর বড় ক্লাবে যোগ দেওয়ার ঘটনা শুধু এই কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সময়ে জর্জ হাজি, দেজান স্ট্যানকোভিচ, কার্লোস সালসিদো, নিকোলাস ওতামেন্দি, এডিনসন কাভানি, সামি খেদিরা, কেইলর নাভাস, এনার ভ্যালেন্সিয়া এবং সর্বশেষ এনজো ফার্নান্দেজও বিশ্বকাপে নিজেদের প্রমাণ করে ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন এনেছেন।

বিশেষ করে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এনজো ফার্নান্দেজ পরে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে চেলসিতে যোগ দেন। একইভাবে কেইলর নাভাস ২০১৪ বিশ্বকাপে কোস্টারিকার হয়ে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করে রিয়াল মাদ্রিদের নজর কাড়েন।

বিশ্বকাপ তাই শুধু ট্রফি জয়ের প্রতিযোগিতা নয়; এটি ফুটবলারদের জন্য নিজেদের সামর্থ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। মাত্র কয়েকটি অসাধারণ ম্যাচই একজন খেলোয়াড়ের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। ছোট ক্লাব থেকে বিশ্বসেরা ক্লাবে যাওয়ার অসংখ্য গল্প তারই প্রমাণ। প্রতি বিশ্বকাপেই নতুন কোনো নায়ক জন্ম নেন, যিনি পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *