মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও আচরণকে বারবার ‘পুতুল নাচ বা লোকদেখানো কূটনীতি’ (Showmanship Diplomacy) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও দেশটির প্রধান পরমাণু আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। ইরানের ওপর একের পর এক সামরিক হামলার হুমকি ও নির্দেশ জারি করে পরবর্তীতে তা রহস্যজনকভাবে প্রত্যাহারের চরম নাটকীয়তার প্রেক্ষাপটে তেহরানের শীর্ষ প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে এই কঠোর মন্তব্য এলো।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
‘হামলা আসছে… থাক, ওরা আলোচনা চায়’— গালিবাফের কটাক্ষ
প্রতিবেদনে জানানো হয়, সম্প্রতি ট্রাম্প ইরানে একটি বড় ধরনের সামরিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা একেবারে শেষ মুহূর্তে বাতিল ঘোষণা করেন। হামলা বাতিলের পর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরানের সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক ‘চুক্তির পরিধি ও খসড়া’ নিয়ে সমঝোতা একপ্রকার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই দাবি কঠোরভাবে নাকচ করে দিয়ে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ওয়াশিংটন মূলত নিজেদের চরম ব্যর্থ ও চাপ প্রয়োগের অসফল কৌশল ঢাকতেই বারবার যুদ্ধ হুমকি দিয়ে পরক্ষণেই আলোচনার গল্প সাজাচ্ছে।”
গালিবাফ ওয়াশিংটনের আচরণকে উপহাস করে লেখেন, “ব্যাপক বড় হামলা আসছে… দাঁড়ান, থাক, ওরা এখন আলোচনা করতে চাইছে! এটি মূলত আমেরিকা সরকারের বহুল চর্চিত থিয়েটার বা লোকদেখানো কূটনীতির পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অসার প্রতিশ্রুতি না দিয়ে বাস্তবতা মেনে নেওয়ার তাগিদ দেন।
ট্রাম্পের দাবি ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা
পূর্বে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো কূটনৈতিক সমাধানের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পরিকল্পিত বড় সামরিক আক্রমণটি স্থগিত রাখার আকুল অনুরোধ জানিয়েছিল। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, সম্ভাব্য নতুন চুক্তির আওতায় কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন ‘হরমুজ প্রণালি’ পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং তেহরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান ঘটবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনী ইরানের ভেতরের অবকাঠামোয় বিমান হামলা চালানোর পর থেকে বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখে ইরান। আন্তর্জাতিক নৌপথটিতে এখন তারা একচ্ছত্র সার্বভৌমত্ব দাবি করছে। প্রণালি বন্ধের প্রভাব ও জ্বালানি কেন্দ্রে পাল্টা হামলায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী আকার ধারণ করেছে।
| হরমুজ প্রণালি সংকট ও তেল বাজার: এক নজরে |
| সংকটের সূত্রপাত: ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা। |
| ইরানের অবস্থান: প্রণালি দিয়ে বিশ্ব নৌচলাচল সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করা। |
| বর্তমান মধ্যস্থতা: ওমানের সঙ্গে যাতায়াতের স্থানাঙ্ক নিয়ে ইরানের খসড়া আলোচনা। |
| ট্রাম্পের মন্তব্য: “যুদ্ধ ও তেলের দাম দ্রুত কমবে, ইরান পরাজিত।” |
সংঘাত কি শেষের পথে নাকি দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি?
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সাথে আলাপে ডোনাল্ড ট্রাম্প আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বিশ্বাস, ইরানের বিরুদ্ধে এই সংঘাত ও যুদ্ধ একেবারে শেষের পথে। খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। কারণ আমার মনে হয় না তেহরানের শাসকগোষ্ঠী আর বেশিদিন এই চরম সংঘাত চালিয়ে নিতে পারবে।”
তবে ট্রাম্পের এই জয়সূচক দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন ইরানি কর্মকর্তারা। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য—মার্কিন ভূরাজনৈতিক আগ্রাসনের মুখে তারা নতিস্বীকার করবেন না এবং এক মাসের লড়াই নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধের মোকাবিলা করতে তেহরান সার্বিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।
