ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলনে অগণিত হতাহতদের শোকসন্তপ্ত স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় আশ্বস্ত করেছেন যে, “আইনের সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত উপায়ে ফ্যাসিবাদের শাসনামলে সংঘটিত প্রতিটি গুম, খুন ও নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করা হবে।”তিনি আরও ঘোষণা দেন, “বিগত ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম এবং রক্তঝরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাঁরা শহিদ হয়েছেন এবং অন্যায্য গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের স্মৃতি অমর করে রাখতে নিজ নিজ এলাকায় রাষ্ট্রীয়ভাবে যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হবে।

“গতকাল বুধবার (৫ আগস্ট ২০২৬) সকালে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে নবনির্মিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক এক আবেগঘন আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।‘গণঅভ্যুত্থানের একক কোনো মহানায়ক নেই, মূল নায়ক দেশের জনগণ’স্মৃতি জাদুঘরের মূল চেতনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “গণতন্ত্রকামী দেশবাসী আশা করে এই জাদুঘর কোনো সুনির্দিষ্ট দল, গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির একচ্ছত্র রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হবে না। ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তির নয়; বরং এই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ও একমাত্র মহানায়ক হলো বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী আপামর জনগণ।”মুক্তিযুদ্ধের সাথে এর ঐতিহাসিক তুলনা টেনে তিনি বলেন, “১৯৭১ সালের বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, আর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান হলো দেশ ও জনগণের সেই অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করার যুদ্ধ।

একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জাতি যেমন শ্রদ্ধার সাথে মনে রেখেছে, ঠিক তেমনি ২০২৪-এর বিপ্লবের অমর শহিদদেরও জনগণ চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।”দেশজুড়ে পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা সম্পর্কে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক নানা ইস্যু উসকে দিয়ে নিজেদের অজান্তেই পলাতক ও পরাজিত স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছেন কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে।”গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর: অতিরঞ্জনহীন সত্য ইতিহাসের দলিলসুদীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের নজিরবিহীন তাণ্ডব স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন ও অমলিন মাইলফলক। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছেন, লাখ লাখ বিরোধী কর্মী হামলা-মামলায় ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছেন। শুধু জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমাতে আকাশ থেকে হেলিকপ্টারে গুলি চালিয়ে শিশু ও নারীসহ হাজারো মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা সভ্য দুনিয়ায় নজিরবিহীন।

“জাদুঘরের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি তাগিদ দেন যে, অসম্পূর্ণ বা অতিরঞ্জিত বয়ান ইতিহাসকে দুর্বল করে। তাই বস্তুনিষ্ঠ সত্য বজায় রেখে বাংলা ও ইংরেজি সহ আন্তর্জাতিক ভাষায় এখানে ইতিহাস সংরক্ষণ করা হবে, যেন বিশ্ববাসী বাংলাদেশের এই সংগ্রামের কথা জানতে পারে। একই সাথে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসসহ দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চিত্রও এখানে স্থায়ী রূপ পাবে।আহত যোদ্ধাদের বিদেশ চিকিৎসা ও রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসনবিপ্লবে আহত বীরদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান:বিনামূল্যে চিকিৎসা ও বিদেশ প্রেরণ: দেশে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসার পাশাপাশি গুরুতর আহতদের থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়া পাঠানো হয়েছে।

বর্তমানে ৫০ জন যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন।মাসিক ভাতা প্রদান: গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারেরও বেশি আহত জুলাই যোদ্ধার নিজ নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শ্রেণিভিত্তিক নিয়মিত মাসিক সম্মানী ভাতা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।রাষ্ট্র সংস্কারের পদক্ষেপ: বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।সংবিধান সংস্কার ও গণভোট: জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদে গঠিত ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ ইতোমধ্যে গঠনমূলক কাজ শুরু করেছে।জুলাই যোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের জন্য গৃহীত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপসমূহ (২০২৬)আইনি বিচার: যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিটি গুম ও হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিতকরণ।প্রতিষ্ঠানের নামকরণ: শহিদ ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের নামে তাঁদের নিজ এলাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ।

উন্নত চিকিৎসা: গুরুতর ৫০ জন আহত যোদ্ধা থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়ায় রাষ্ট্রীয় খরচে চিকিৎসাধীন।ভাতা প্রদান: ১৩,০০০+ গেজেটভুক্ত আহত যোদ্ধাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি মাসিক সম্মানী ভাতা।সংবিধান ও সনদ: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটির কাজ শুরু।অনুষ্ঠানের শেষভাগে প্রধানমন্ত্রী সংকটময় মুহূর্তে দেশ ও জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, “বাংলাদেশ আর কখনোই কোনো দেশের তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।”বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি ও অনুভূতিসংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলার স্বাগত বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে জুলাই শহিদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা তুজ জোহরা, শহিদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং আহত জুলাই যোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তির আবেগঘন স্মৃতিতর্পণে মিলনায়তনে এক ট্র্যাজিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন—অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।এছাড়াও আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আমন্ত্রিত কূটনীতিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মী ও জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্যরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *