গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনকালে দেশজুড়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিউরে ওঠা চিত্র তুলে ধরে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, “বিগত ১৬ বছরে দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষকে কোনো বিচার ছাড়াই ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ৭০০-এরও বেশি নিরপরাধ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন—যাঁদের স্বজনরা আজও গভীর রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে চোখের জল ফেলে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন।”
গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ‘বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশন’ আয়োজিত এক বিশেষ জাতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব ক্ষোভ ও বেদনার কথা প্রকাশ করেন।
‘মৃত ব্যক্তি ও হজযাত্রীদের নামেও দেওয়া হয়েছিল গায়েবি মামলা’
তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর চলা নজিরবিহীন আইনি হয়রানির ফিরিস্তি দিয়ে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “কেবল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চার অভিযোগে ৬০ লাখেরও বেশি সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীকে হাজার হাজার মিথ্যা ও কাল্পনিক গায়েবি মামলায় আসামি করা হয়েছে। এমন নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে যেখানে কবরে শুয়ে থাকা মৃত ব্যক্তি কিংবা পবিত্র হজে অবস্থানরত ব্যক্তিকেও বোমাবাজি, নাশকতা ও ডাকাতির জঘন্য মামলায় আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে।”
বক্তব্যের শুরুতেই আইনমন্ত্রী ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহিদদের গভীর শ্রদ্ধা ও অনুশোচনার সাথে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে নিহত, গুমের শিকার ও পঙ্গুত্ববরণকারী সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান।
আইনমন্ত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “জুলাই আন্দোলনের মাত্র ২০ দিনের (১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট) অভাবনীয় রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অগণিত তরুণ ও সাহসী মানুষ জীবন উৎসর্গ করে আমাদের নতুন এক মুক্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিয়েছেন। প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষ এই গণঅভ্যুত্থানে হাত, পা কিংবা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন; বহু মানুষ দেহে বুলেটের আঘাত ও স্প্লিন্টার নিয়ে বেঁচে আছেন। তাঁদের এই অমূল্য আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।”
জুলাইয়ের চেতনা ছড়ায়ে দিতে শিল্পীদের এগিয়ে আসার আহ্বান
দীর্ঘদিনের জুলুম ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার বিপ্লব নতুন বাংলাদেশের যে মানবিক স্বপ্ন দেখিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সাংস্কৃতিক কর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, “একটি শোষণহীন, বৈষম্যহীন, সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে আমাদের আবৃত্তিশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মেধা ও কণ্ঠস্বরের ভূমিকা অপরিসীম।”
বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশনের দেশব্যাপী টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত জুলাইয়ের বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচি এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহের কবিতাকে যুক্ত করার উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
সংগঠনটির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের অগ্রজ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে আসাদুজ্জামান বলেন, “মেহেদী হাসান একজন সৎ ও সাদা মনের বিরল মানুষ। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আবৃত্তি ফেডারেশন যে নির্মল ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আমার ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক পূর্ণ সমর্থন তাঁদের প্রতি থাকবে।”
বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদী হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই প্রাণবন্ত আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, আইনমন্ত্রীর সহধর্মিণী শিরিন সুলতানা এবং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান। অনুষ্ঠানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা বিপুল সংখ্যক প্রবীণ ও নবীন আবৃত্তিশিল্পী, শিশু-কিশোর এবং সংস্কৃতি অনুরাগী দর্শক উপস্থিত ছিলেন।
