গণমানুষের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক অবিস্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অনুঘটক ছিল ‘জুলাই’। বাঙালি জাতির স্মৃতিতে জুলাই কেবল একটি নির্দিষ্ট মাস নয়, এটি দীর্ঘ ৩৬ দিনের এক রক্তঝরা আন্দোলন। জুলাই আমাদের প্রতিমুহূর্তে মনে করিয়ে দেয় কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই জাতি অভাবনীয় শক্তি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল—এমনটাই জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বুধবার (৫ আগস্ট) ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে এসব কথা বলেন তিনি।
শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা
বাণীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। একই সাথে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে যাঁরা গুরুতর আহত হয়েছেন, চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন—তাঁদের অসীম ত্যাগের প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন:
“আজকের এই দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন সেইসব বীর শহীদদের। অসীম কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যাঁরা আন্দোলনে আহত হয়েছেন, দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন।”
সর্বস্তরের মানুষের অভূতপূর্ব ঐক্যের প্রতি শ্রদ্ধা
বিবৃতিতে জুলাই আন্দোলনে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন:
- শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-অভিভাবক: স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল, জুলাই তাঁদের। আর যেসব শিক্ষক ও অভিভাবক তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা।
- গণমাধ্যম ও সত্য প্রকাশ: যেসব সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থেকে অকুতোভয়ভাবে সত্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন।
- সংস্কৃতিকর্মী ও পেশাজীবী: রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা নিজেদের কণ্ঠ ও সৃজনশীলতা দিয়ে আন্দোলনের মূল শক্তি জুগিয়েছেন।
- শ্রমজীবী ও চিকিৎসক দল: রিকশাচালক, খেটেখাওয়া শ্রমজীবী মানুষ ও বিভিন্ন পেশাজীবী গণমানুষের এই আন্দোলনে শরিক হন। যুদ্ধসদৃশ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের চিকিৎসা ও জীবন রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন।
- প্রবাসী বাংলাদেশিরা: বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করে আন্দোলনের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন।
নারী ও তরুণদের সাহসিকতার অনন্য মাইলফলক
বাণীতে নারীদের ভূমিকা বিশেষভাবে তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, জুলাইয়ে দেশের নারী সমাজ যে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে আন্দোলন টিকিয়ে রেখেছিলেন, তা আগামী দিনের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের নারীদের অনুপ্রাণিত করবে এবং তরুণ সমাজকে সাহস জোগাবে। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অনন্য ও সাহসী নেতৃত্ব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরুণদের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
বিবৃতির শেষাংশে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বলেন:
“জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের প্রত্যক্ষভাবে শিখিয়েছে—দেশের সর্বস্তরের মানুষ যখন এক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তারা সবচেয়ে দুর্ভেদ্য ও শক্তিশালী বলে মনে হওয়া শাসন কাঠামোকেও বদলে দিতে পারে। ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে আমরা যে বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রা শুরু করেছি, তা যেকোনো মূল্যে অক্ষুণ্ণ রাখার শক্ত সংকল্প আমাদের আজ গ্রহণ করতে হবে।”
