এই সরকার কোনোভাবেই আর এক মিনিটও ক্ষমতায় থাকার বৈধতা রাখে না: নাহিদ ইসলাম

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। আন্দোলনকারীদের কাছে দিনটি পরিচিত ছিল ‘৩৪ জুলাই’ নামে। রক্তাক্ত জুলাইয়ের ধারাবাহিকতায় সেদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হন। সেখান থেকেই তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবি ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করতে অসহযোগ কর্মসূচিরও ডাক দেওয়া হয়।

এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সংঘর্ষ, প্রাণহানি, কারফিউ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মধ্যেও আন্দোলন অব্যাহত ছিল। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি আন্দোলনে নতুন গতি যোগ করে। জাতীয় পতাকা হাতে অংশগ্রহণকারীদের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিশাল জনসমাগমে সমাবেশস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

শহীদ মিনার থেকেই ‘এক দফা’ ঘোষণা

সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দফার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এই সরকার কোনোভাবেই আর এক মিনিটও ক্ষমতায় থাকার বৈধতা রাখে না।”

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের মূল দাবি সরকার পতনে কেন্দ্রীভূত হয়। পাশাপাশি সারা দেশে অসহযোগ কর্মসূচি পালনেরও আহ্বান জানানো হয়।

কেন ৩ আগস্টেই ঘোষণা?

পরে এ বিষয়ে সাবেক সমন্বয়ক ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, আন্দোলনের শুরুতেই এক দফা ঘোষণা না দিয়ে সময় নেওয়ার পেছনে কৌশলগত কারণ ছিল।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেকেই ২ আগস্ট রাতেই ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এক দফা ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে আন্দোলনের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত ছিল, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর জনগণের সামনে উপস্থিত হয়েই এই ঘোষণা দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, জনগণকে জীবন বাজি রেখে রাজপথে নামার আহ্বান জানাতে হলে নেতৃত্বকেও প্রকাশ্যে এসে সেই সাহসের পরিচয় দিতে হতো। সে কারণেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকেই এক দফা ঘোষণা এবং অসহযোগ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।

সরকারের আলোচনা আহ্বান

এদিকে আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ বাড়তে থাকলেও সেদিন সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে কঠোর অবস্থানের বার্তাও দেওয়া হয়।

সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “গণভবনের দরজা খোলা। যথাযথ তদন্ত করে তাদের বিচার হবে।”

তবে এই আহ্বানে আন্দোলনকারীরা সাড়া দেননি। বরং সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে থাকে।

আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির পরে বলেন, আগস্টের শুরু থেকেই এক দফা দাবির বিষয়ে আলোচনা চলছিল। ৩ আগস্টের শহীদ মিনারের কর্মসূচিতেও তাদের সংগঠনের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

তার মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা।

সংঘর্ষ ও প্রাণহানির খবরও আসে

৩ আগস্ট একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন জেলা থেকে হতাহতের খবর আসতে থাকে, যা আন্দোলনের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে আরও প্রকট করে তোলে।

আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া দিন

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকেই সরকার পতনের এক দফা দাবির ঘোষণা ২০২৪ সালের আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। এর পর আন্দোলন আরও সংগঠিত রূপ নেয় এবং কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে সরকার পতনের আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ৩ আগস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে আলোচিত হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *