একসময় যাঁর উপস্থিতি স্ক্রিনে মানেই ছিল নায়ক-খলনায়কের হাড্ডাহাড্ডি মার্শাল আর্ট ও শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই, সেই অ্যাকশন তারকা ইলিয়াস কোবরা এখন আর আলোঝলমলে রুপালি পর্দায় নেই। দীর্ঘ চার দশকের বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনের ইতি টেনে তিনি এখন জন্মভূমি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীয়াপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। প্রতিদিনের সময় কাটছে মসজিদে ইবাদত-বন্দেগি, কৃষিকাজ, গরু-ছাগলের খামার পরিচর্যা এবং এলাকার মানুষের জন্য আত্মনিবেদিত সামাজিক কর্মকাণ্ডে।
গ্রামবাসীর ভালোবাসায় গড়ে উঠেছে ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’
টেকনাফের বাহারছড়ার পাকা সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’। স্থানীয়দের দেওয়া এই বাজারেই এখন প্রায় ৪৫টিরও বেশি দোকানপাট রয়েছে, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি উৎপাদিত তাজা মাছ, শাকসবজি, পান-সুপারি ও ফলের বেচাকেনা হয়।
নিজের নামে বাজার প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ইলিয়াস কোবরা জানান, এলাকাটির নাম নোয়াখালী বা নোয়াখালীয়াপাড়া হওয়ায় বাইরে থেকে আসা দর্শনার্থী ও পাইকাররা গুলিয়ে ফেলতেন। ২০১৫ সালে তিনি গ্রামে এলে স্থানীয় মানুষ তাঁর কাছে এই জায়গায় একটি স্থায়ী বাজার বসিয়ে সেটির নাম ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’ রাখার প্রস্তাব দেন। গ্রামবাসীর আবেগ ও তাগিদ দেখে তিনি সম্মতি দিলে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বাজারটির পথচলা শুরু হয়। এতে করে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে টেকনাফ সদরে কেনাকাটা করতে যাওয়ার কষ্ট থেকে রেহাই পান স্থানীয়রা।
পাহাড়ে অপহরণ ও মানব পাচার রুখতে মাঠে কোবরা
চলচ্চিত্র জীবন ত্যাগ করে গ্রামে ফিরলেও পাহাড়ি অঞ্চলে জলদস্যু, সন্ত্রাসী ও মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্যের কারণে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন এই অভিনেতা। টেকনাফের পাহাড়ঘেঁষা গ্রামগুলো থেকে দু-এক দিন পরপরই সন্ত্রাসীরা নিরীহ মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে থাকে।
এই সামাজিক আতঙ্ক ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন ইলিয়াস কোবরা। এলাকা রক্ষা ও সন্ত্রাস রুখতে গ্রামবাসীকে চারটি দলে ভাগ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবী তরুণ রাত জেগে পর্যায়ক্রমে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে এমন পাহারার ব্যবস্থা করায় এলাকায় অপহরণের ঘটনা অনেকটাই কমে এসেছে।
চার দশকের অভিনয় জীবন ও মার্শাল আর্টের প্রবাদপুরুষ
১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি টেকনাফে জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ ইলিয়াস (চলচ্চিত্রের নাম ইলিয়াস কোবরা) চলচ্চিত্রে আসার আগে পেশাদার মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক হিসেবে টেকনাফ, কক্সবাজার ও ঢাকায় একাধিক ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করতেন।
১৯৮৭ সালে প্রখ্যাত চিত্রনায়ক ও পরিচালক সোহেল রানার ‘মারুফ শাহ’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। এরপর দীর্ঘ ৪০ বছরের ক্যারিয়ারে পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে খলনায়ক ও অ্যাকশন চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থান করে নেন। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে রুবেল ও রতন তালুকদারের মতো মার্শাল আর্ট নায়কদের সাথে তাঁর পর্দার ফাইট ছিল তুমুল জনপ্রিয়। অভিনয়ের বাইরে তিনি ‘ভাইয়া নাম্বার ওয়ান’ প্রযোজনা করেন এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
‘পাঁচ শতাধিক ছবি করেছি, আর ফিরতে চাই না’
বর্তমানে মা, স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে সুখের দিন কাটাচ্ছেন এই সাবেক তারকা। স্ত্রী-সন্তানরা ঢাকা-টেকনাফ আনাগোনা করলেও তিনি স্থায়ীভাবেই গ্রামে মাটি ও মানুষের পাশে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে স্থানীয় সাগরপাড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং নিজ উদ্যোগে মসজিদ পুনর্নির্মাণ, কবরস্থান সম্প্রসারণ ও একটি নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি ক্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন।
সিনেমা জীবনে ফেরার প্রসঙ্গে ইলিয়াস কোবরা স্পষ্ট জানান, “৪০ বছর সিনেমা করেছি, পাঁচশর বেশি ছবিতে কাজ করেছি। কিন্তু সেই ঝলমলে জীবনে আর কখনোই ফিরতে চাই না। জীবনের বাকি সময়টা জন্মভূমিতে থেকেই কাটাতে চাই। কৃষিকাজ, ইবাদত-বন্দেগি আর মানুষের সামান্য উপকার করতে পারলে সেখানেই আমার আসল শান্তি।”
