সাড়ে ছয় বছরে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১,৩৮৪, সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন পথচারী

রাজধানী ঢাকায় গত সাড়ে ছয় বছরে (২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত) মোট ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৩৮৪ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে এসব দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ২ হাজার ৪৮৮ জন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন সাধারণ পথচারী এবং মোটরসাইকেল আরোহীরা।

আজ শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকার সড়ক দুর্ঘটনার এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।

নিহতের পরিসংখ্যান ও ধরন

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ১ হাজার ৩৮৪ জনের লিঙ্গ ও বয়স ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়:

  • পুরুষ: ১ হাজার ৩৪ জন
  • নারী: ২১৯ জন
  • শিশু: ১৩১ জন

দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ধরন বিশ্লেষণ:

  • পথচারী: ৪২.৭৭ শতাংশ (সর্বোচ্চ)
  • মোটরসাইকেল আরোহী: ৩৮.৭২ শতাংশ
  • অন্যান্য: ১৮.৪৯ শতাংশ (বাস, রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালক ও যাত্রী)

রাতের ঢাকা সবচেয়ে ভয়ংকর ও দায়ী যানবাহন

পরিসংখ্যানে দুর্ঘটনার সময়কাল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে রাতের অন্ধকারে। মোট প্রাণহানির ৩৭.৫০ শতাংশই রাতের বেলায় হওয়া দুর্ঘটনায় ঘটেছে। এছাড়া সকালে ১৮.৬৪%, দুপুরে ১৪.৮০%, বিকেলে ১২.৫৭%, ভোরে ১০.২৬% এবং সন্ধ্যায় ৬.৯৩% দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের হার: ১. ভারী বা মালবাহী যান (ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্যাংকার ও ময়লাবাহী ট্রাক) – ৩৩.২৫% ২. মোটরসাইকেল – ২৬.০০% ৩. যাত্রীবাহী বাস – ২১.৭৫% ৪. থ্রি-হুইলার (অটোরিকশা, সিএনজি, লেগুনা) – ১২.৭৩% ৫. ব্যক্তিগত গাড়ি (মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও জিপ) – ৬.২৫%

দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ও হটস্পট

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ মতে, রাজধানী ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • রাতে ভারী ও মালবাহী যানবাহনের বেপরোয়া গতিতে চলাচল।
  • যানজটের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘসূত্রিতায় চালকদের চরম অসহিষ্ণুতা ও ক্লান্তি।
  • অপ্রতুল সড়ক ব্যবস্থা এবং একই সড়কে বিভিন্ন গতির (ধীর ও দ্রুতগামী) যানবাহনের মিশ্র চলাচল।
  • ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়া এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থার (জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভার ব্রিজ) ব্যাপক ঘাটতি।

সংগঠনটি তাদের গবেষণায় ঢাকার কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকাকে দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এলাকাগুলো হলো— যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর সড়ক।

পরিস্থিতি উন্নয়নে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

ভয়াবহ এই প্রাণহানি ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বেশ কিছু কার্যকর সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে যত্রতত্র বাস চলাচল বন্ধ করে দ্রুত ‘কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস’ চালুর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় জড়িত সংস্থাগুলো— বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি কর্পোরেশন এবং ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার বিশেষ সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *