বন্ধ সরকারি শিল্প-কারখানা ২০২৬ সালের মধ্যে চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে থাকা সরকারি শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর সার্বিক প্রক্রিয়া আগামী ২০২৬ সালের মধ্যেই চূড়ান্তভাবে শেষ করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আমলাতান্ত্রিক সব ধরনের জটিলতা উপড়ে ফেলে দ্রুততার সঙ্গে বেসরকারীকরণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে জাতীয় উৎপাদন শুরু করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই ২০২৬) বিকেলে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ প্রদান করেন। একই দিনে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে মাথায় গুলিবিদ্ধ বীর যোদ্ধা শেখ আজিজুর রহমানের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎ করেন এবং জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করা তিনজন অদম্য ব্যক্তির হাতে সরাসরি চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন।

বন্ধ শিল্প-কারখানা চালু ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের তাগিদ

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন সাংবাদিকদের জানান, দীর্ঘদিন ধরে অলস পড়ে থাকা সরকারি ভারী ও মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলো দ্রুত সচল করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, অযথা প্রশাসনিক বিলম্ব দূর করে কাজে শতভাগ গতি আনয়ন এবং বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত উৎপাদনে যাওয়ার বিষয়ে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ২০২৬ সালের মধ্যেই এই পুরো পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি দেশে শিল্পায়নের স্বার্থে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর; বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম; বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মাথায় গুলিবিদ্ধ জুলাই যোদ্ধা আজিজুরের সাথে প্রধানমন্ত্রীর আবেগঘন সাক্ষাৎ

এর আগে দুপুরে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাহসী যোদ্ধা শেখ আজিজুর রহমানের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে জানান, সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে ‘গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও শুধু ছাত্রদল করার কারণে মেলেনি জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিকোণগোচর হয়। বিষয়টি জানার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে পুরো ঘটনাটি দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে আজিজুরকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান।

সাক্ষাৎকালে আজিজুর ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় মিরপুর-১০ নম্বর ফ্লাইওভারে মাথায় মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে মাথায় জড়িয়ে রাখা সেই রক্তমাখা ঐতিহাসিক জাতীয় পতাকাটি পরম শ্রদ্ধায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী পরম মমতায় আজিজুরের শারীরিক চিকিৎসা, লেখাপড়া ও সংসার চালানোর কঠিন সংগ্রামের খোঁজখবর নেন। নড়াইলের লোহাগড়ার সন্তান ও সরকারি বাঙলা কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আজিজুর দীর্ঘ দুই বছর ‘জুলাই যোদ্ধা’র সরকারি স্বীকৃতি না পেয়ে সংসার চালাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের পর আজিজুর আবেগপ্লুত কণ্ঠে জানান, এই সাক্ষাৎ তাঁর জীবনের সেরা স্বপ্নপূরণ এবং নিজের কষ্টের মূল্যায়ন হওয়ায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।

পা দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর শেষ করা ২ নারীসহ ৩ প্রতিবন্ধীকে চাকরি

এদিকে গতকাল সকালে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে প্রবেশের সময় গাইবান্ধার আয়শা আক্তার, সিরাজগঞ্জের নীলা খাতুন এবং নড়াইলের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. হাসমত আলীর হাতে সরাসরি সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে আত্মনির্ভরশীল হওয়া এবং সমাজের মূলধারায় এই অদম্য ব্যক্তিদের মর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন।

নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে জন্ম থেকেই হাত না থাকা আয়শা আক্তার ও নীলা খাতুন পা দিয়ে লিখে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নীলা খাতুনকে মিরপুরের জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে শিক্ষক এবং আয়শা আক্তারকে গাইবান্ধার বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাস সুপারভাইজার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. হাসমত আলীকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদে পদায়ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বপ্নের নিয়োগপত্র পেয়ে তিনজনই বাকরুদ্ধ ও উচ্ছ্বসিত আনন্দ প্রকাশ করেন।

নিয়োগপত্র বিতরণকালে সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *