রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মাধ্যমে দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটি কালো ছায়া সরে গেছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং তারা আগেই মনে করেছিলেন যে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের নৈতিক ও সাংবিধানিক যোগ্যতা হারিয়েছিলেন।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টু রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। তিনি বলেন, “তিনি কী কারণে পদত্যাগ করেছেন, সে বিষয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ আমরা আগেই বিবেচনায় নিয়েছি যে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।”
সংবিধান অনুযায়ী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব
সংবাদ সম্মেলনে তিনি সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় বর্তমান স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এ জন্য তিনি স্পিকারকে অভিনন্দন জানান এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “তিনি যত দিন এই দায়িত্ব পালন করবেন, আমরা আশা করি তিনি ন্যায়নিষ্ঠ, নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবেন। এমনকি একদিনের জন্যও যদি তিনি দায়িত্ব পালন করেন, তবুও আমরা চাই তিনি একই নীতিতে অটল থাকুন।”
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি যদি সংবিধান ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করেন, তাহলে বিরোধী দল তার প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
৯০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হবে বলে তারা আশা করছেন।
তিনি বলেন, “যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় আসবে, তখন আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকা দেশবাসী দেখতে পাবে। আমরা চাই, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে যাক এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হোক।”
তিনি আরও বলেন, স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করায় সংবিধান অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন। শপথ গ্রহণের মাধ্যমে এ সাংবিধানিক দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে। তাই এ বিষয়ে কোনো সাংবিধানিক সংকটের সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
‘যোগ্য ও মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রপতি চাই’
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা এমন একজন রাষ্ট্রপতি চান যিনি রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষা করবেন এবং কোনো রাজনৈতিক তোষামোদে জড়াবেন না।
তিনি বলেন, “আমরা এমন রাষ্ট্রপতি চাই, যিনি সংবিধান ও রাষ্ট্রের নীতির প্রতি অনুগত থাকবেন। অন্য কারো নির্দেশে নয়, নিজের বিবেক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করবেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন।”
তার মতে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কারে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তোষামোদের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক পদধারী যেন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষ্য।
সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা?
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জানতে চান, পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হবে কি না।
জবাবে জামায়াত আমির বলেন, “যদি তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নন। তখন বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা আমাদের রাজনৈতিক ও আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করব।”
তিনি স্পষ্ট করেন, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নীতিতেই তারা বিশ্বাসী।
গণহত্যা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভূমিকার সমালোচনা
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, দেশের সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেননি।
তার ভাষায়, “অভিভাবক হিসেবে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। গণহত্যা ও জনগণের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা তার কাছ থেকে একটি প্রতিবাদী বক্তব্যও শুনিনি। তিনি কখনো বলেননি ‘এটা থামাও’, ‘এটা অন্যায়’ কিংবা ‘জনগণের ওপর জুলুম হচ্ছে’। নীরব থেকে তিনি কার্যত এসব কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির নীরবতা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
দেশে চিকিৎসা নেওয়ার আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির অসুস্থতার প্রসঙ্গও উঠে আসে। এ বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যদি তিনি সত্যিই অসুস্থ হয়ে থাকেন, তাহলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমানো উচিত।
তিনি বলেন, “আমি চাই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা যে-ই হোন, সবাই যেন দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন। দেশের চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রতি আস্থা না থাকলে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন কখনো সম্ভব হবে না। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনা যেতে পারে, কিন্তু দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।”
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, একসময় চিকিৎসকেরা তাকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি দেশে থেকেই চিকিৎসা নিয়েছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের বক্তব্যও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
