২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চে স্পেনের কাছে ০-১ গোলে হেরে পর্তুগালের বিদায় নেওয়ার পর কেটে গেছে বেশ কিছু দিন। কিন্তু বিদায়ের চেয়েও বড় এক দীর্ঘশ্বাস আর শূন্যতা ঘিরে ধরেছে পর্তুগিজ ফুটবলকে। বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে যখন মাঠ ছাড়ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, তখন তা শুধু একজন ফুটবলারের প্রস্থান ছিল না; বরং অবসান ঘটল ২৩৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও ১৪৬টি গোলের এক ঐতিহাসিক ২০ বছরের মহাকাব্যের।
তবে মাঠের চেয়েও বড় ধাক্কা ও ঝড় বইতে শুরু করেছে পর্তুগালের ফুটবল অর্থনীতির অন্দরে। বিশ্বজুড়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে—পর্তুগাল ফুটবল কি এতদিন আসলে একটি দেশ বা দল ছিল, নাকি কেবলই একটি মানুষের ব্র্যান্ড নাম?
“রোনালদো একা পর্তুগাল জাতীয় দলের চেয়েও বড়”
পর্তুগিজ ইনস্টিটিউট অব মার্কেটিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের নির্বাহী পরিচালক দানিয়েল সা বিশ্ব ফুটবলের সামনে এক রূঢ় সত্য তুলে ধরেছেন:
“ব্র্যান্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে বললে কথাটা কঠোর শোনাবে, কিন্তু রোনালদো একা পর্তুগাল জাতীয় দল এবং আরও অগণিত দেশের সমন্বিত আকারের চেয়েও তুলনাহীনভাবে বড়।”
দানিয়েল সা জানান, টিভির আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টাররা যখন পর্তুগালের ম্যাচের সূচি কেনে, তারা ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা রাফায়েল লিয়াওয়ের ছবি দেখিয়ে ব্যবসা করে না। তারা বিক্রি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ১০০ কোটি অনুসারী থাকা এক মহামানবকে—যাঁর ইউটিউব চ্যানেল ‘UR Cristiano’ চালু হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিটে ১০ লাখ সাবস্ক্রাইবার অতিক্রম করেছিল।
দানিয়েল সা এই পতনকে এক ভয়াবহ রূপকে সংজ্ঞায়িত করে বলেছেন, ‘দ্রুতগামী এস্কেলেটর থেকে নিচে পড়ে যাওয়া’। তাঁর মতে, সিআর সেভেন চলে গেলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলো ও কোটি কোটি স্পনসরশিপের যে জোয়ার এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে যাবে, তা কোনো ধীরগতির পতন নয়, বরং দ্রুতবেগে নিচে নেমে আসার মতো হবে।
১.২ বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য ও স্পনসরশিপের শূন্যতা
ফোর্বসের হিসাবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিলিয়নিয়ার, যার বর্তমান নিট সম্পত্তি প্রায় ১২০ কোটি ডলার এবং ক্যারিয়ারের মোট আয় ২০০ কোটি ডলার স্পর্শ করেছে। নাইকির (Nike) সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের আজীবন চুক্তি কিংবা সৌদি ক্লাব আল নাসরের আকাশচুম্বী বেতন মিলিয়ে রোনালদোর বাৎসরিক আয় বিশ্বের বহু দেশের ফুটবল বাজেটের চেয়েও বেশি।
বিগত দুই দশকে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের (FPF) প্রতিটি বাণিজ্যিক চুক্তি ও স্পনসরশিপের নথিতে অদৃশ্যভাবে নাম লেখা থাকত এই মহাতারকার। বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো পর্তুগালের জার্সিতে টাকা ঢালত মূলত ‘সিআর সেভেন’ ব্র্যান্ডের অংশ হতে।
মেধা আছে, কিন্তু শূন্যতা পূরণের সাধ্য কার?
মাঠের পারফরম্যান্সের বিচারে পর্তুগাল দলে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। জোয়াও নেভেস, ভিতিনিয়া, পেদ্রো নেতো কিংবা দিয়োগো কস্তারা ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে রাজত্ব করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মাঠের নৈপুণ্য দিয়ে পয়েন্ট টেবিল সামলানো গেলেও স্পনসরশিপের খাতায় রোনালদোর তৈরি করে যাওয়া শতকোটি ডলারের বাণিজ্যিক শূন্যতা কে পূরণ করবে?
সবচেয়ে নির্মম সত্যটা হলো—বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সিআর সেভেনের সুবিশাল ভক্তগোষ্ঠীর সিংহভাগই পর্তুগাল দেশকে নয়, ভালোবাসে কেবল রোনালদোকে। রোনালদো যখন জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখবেন, সেই কোটি কোটি অনুরাগীও পর্তুগালের সাপোর্ট ছেড়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে। আর সেই আলো নিভে যাওয়ার পর পর্তুগিজ ফুটবলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কতটা অরক্ষিত হয়ে পড়বে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
