মন্ত্রীর পদত্যাগে কি থামবে ভারতের ছাত্র আন্দোলন? মোদির সামনে এখন আরও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা

ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে দেশটির চলমান ছাত্র আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনকারীদের দাবি উপেক্ষা করে আসা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অবশেষে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মোদি সরকারের জন্য একটি বিরল পিছু হটা এবং ‘তেলাপোকা আন্দোলনের’ প্রথম বড় সাফল্য।

দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া আন্দোলনের মূল দাবি ছিল নিটসহ বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ, শিক্ষানীতির সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। সরকার শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দিলেও আন্দোলন যে গভীর সংকট সামনে এনেছে, তা এখনো বহাল রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্দোলনের কারণে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা হাজারো শিক্ষার্থী দিল্লিতে সমবেত হন। ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বিভাজন ভুলে তারা নিজেদের ‘ভারতীয় শিক্ষার্থী’ পরিচয়ে একত্রিত হন। আন্দোলনের সময় যন্তর মন্তর এলাকা কার্যত জাতীয় প্রতিবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, স্বতন্ত্র কর্মী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা এবং অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে।

২০ জুলাই সংসদ ভবনমুখী কর্মসূচির পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সীমিত করা, একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। পরবর্তীতে সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। তবে আন্দোলনের নেতারা স্পষ্ট করে দেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন না। অবশেষে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই দাবির বাস্তবায়ন ঘটে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে প্রশ্নপত্র ফাঁস, উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব, পরীক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না। বরং এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে, সংঘবদ্ধ জনচাপ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ভারতের বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কাঠামো, বহুদলীয় রাজনীতি, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতিপথকে আলাদা করে তুলেছে। এখন পর্যন্ত আন্দোলনটি মূলত শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে; এটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়নি।

এদিকে শাসক দল বিজেপি আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ তুললেও বিরোধী দলগুলোও এখনো সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি ও ডিএমকের মতো দলগুলো সরাসরি আন্দোলনের নেতৃত্বে না থাকলেও পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি কৃষক, শ্রমিক বা অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠী এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা সরকারের জন্য আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ আপাতত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করলেও এটি মোদি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। কৃষক আন্দোলনের পর দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের জনচাপের মুখে সরকারকে ছাড় দিতে হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আন্দোলন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে যন্তর মন্তরের আন্দোলন সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও ভারতের রাজনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, কর্মসংস্থান এবং তরুণদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *