কুয়াকাটার জেলের জালে ২.১ কেজির ইলিশ, বিক্রি হলো ৬,৮২৫ টাকায়

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে জেলের জালে ধরা পড়েছে ২ কেজি ১০০ গ্রাম ওজনের একটি বড় আকৃতির ইলিশ। দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে এমন বড় ইলিশ পাওয়ায় আনন্দে উচ্ছ্বসিত জেলেরা। মাছটি মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নিলামের মাধ্যমে প্রতি মণ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ওই হিসাবে ২ কেজি ১০০ গ্রাম ওজনের ইলিশটির দাম দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮২৫ টাকা।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে এফবি জারিফ-তারিফ নামের একটি ফিশিং ট্রলারের জেলে মো. দেলোয়ার মাঝির জালে ধরা পড়ে এই বড় ইলিশটি। পরে মাছটি মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মেসার্স মনোয়ারা মৎস্য আড়তে নিয়ে আসা হয়। সেখানে স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে নিলাম অনুষ্ঠিত হলে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন মাছটি কিনে নেন।

ক্রেতা ফারুক হোসেন জানান, বড় আকৃতির ইলিশের চাহিদা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সবসময়ই বেশি থাকে। তাই মাছটি দ্রুত ঢাকার বাজারে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, বড় ইলিশ সংগ্রহ করতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে। বাজারে এমন মাছের আলাদা কদর রয়েছে এবং বিশেষ উপলক্ষেও বড় ইলিশের চাহিদা বাড়ে।

মেসার্স মনোয়ারা মৎস্য আড়তের ম্যানেজার সগির আকন জানান, নিলামে মাছটির প্রতি মণ মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সেই অনুযায়ী ২ কেজি ১০০ গ্রাম ওজনের মাছটির দাম দাঁড়ায় ৬ হাজার ৮২৫ টাকা। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বড় আকারের ইলিশ খুব বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এ ধরনের মাছ বাজারে এলে ক্রেতাদের মধ্যে আগ্রহও তুলনামূলক বেশি থাকে।

ইলিশটি ধরতে সক্ষম হওয়া জেলে মো. দেলোয়ার মাঝি বলেন, সরকারি ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে এমন একটি বড় ইলিশ জালে উঠবে, তা তারা কল্পনাও করেননি। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে বড় ইলিশের সংখ্যা কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে। তবে এই ধরনের একটি মাছ পাওয়ায় ট্রলারের সবাই আনন্দিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে সাগরে আরও বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়বে।

একই ট্রলারের আরেক জেলে সলেমান বলেন, সেদিনের অভিযানে বড় মাছ বলতে মূলত এই একটি ইলিশই ধরা পড়েছে। অন্যান্য মাছের পরিমাণও খুব বেশি ছিল না। তবে বড় ইলিশটি ভালো দামে বিক্রি হওয়ায় কিছুটা হলেও আর্থিক স্বস্তি মিলেছে। তিনি বলেন, সমুদ্রে এখন বড় ইলিশ আগের মতো সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও আল্লাহ যা দিয়েছেন, তাতেই তারা সন্তুষ্ট।

স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দিকে বড় ইলিশের দেখা মিললেও এবার তুলনামূলক কম ধরা পড়ছে। তারা মনে করছেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন, সাগরের পরিস্থিতি এবং মাছের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তনের কারণেও এমনটি হতে পারে। তবে মৌসুম যত এগোবে, ততই ইলিশের উৎপাদন ও আহরণ বাড়বে বলে তাদের প্রত্যাশা।

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, গভীর সমুদ্রের পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকাতেও এখন বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করেছে। এটি জেলেদের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তিনি জানান, সরকারের সময়োপযোগী সংরক্ষণ কার্যক্রম, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন এবং জেলেদের সচেতনতার কারণে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ছিল সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করা। এর সুফল ধীরে ধীরে পাওয়া যাচ্ছে। বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়া তারই একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। আশা করা হচ্ছে, সামনের দিনগুলোতে বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ইলিশের সরবরাহ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং জেলেরাও ভালো আয় করতে পারবেন।

মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিবছর ইলিশ আহরণ ও রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। একই সঙ্গে দেশের লাখো জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীর জীবিকা এই মাছের ওপর নির্ভরশীল। তাই ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার প্রতিবছর বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান এবং জাটকা রক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে।

স্থানীয় বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাজারে মাঝারি আকারের ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও দুই কেজির বেশি ওজনের ইলিশ এখনও বিরল। ফলে এ ধরনের মাছ উচ্চমূল্যে বিক্রি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে রাজধানীসহ বড় শহরের ক্রেতাদের কাছে বড় ইলিশের আলাদা চাহিদা রয়েছে।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সংরক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে বড় আকারের ইলিশের সংখ্যা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে জেলেদের আয়ও বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের সামগ্রিক মৎস্য খাত আরও শক্তিশালী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *