রাজপথ জ্বলে উঠলে সেই আগুনে অনেক কিছু পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে: শফিকুর রহমান

বরিশালের হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় জনসভায় ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদীয় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, যে গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ জনগণ সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট রায় দিয়েছে, সেই একই দিনে আয়োজিত জাতীয় নির্বাচনের ভোটে বিএনপি নিজেদের সরকার হিসেবে দাবি করছে। ফলে ওই গণভোটের রায় যদি সরকার বাস্তবায়ন না করে বা ব্যর্থ করে দেয়, তবে জনগণ এই সরকারকেও ব্যর্থ করে দেবে এবং গণভোট মানতে সরকারকে বাধ্য করবে।

গণভোটের গণরায় দ্রুত বাস্তবায়ন, চরম জনদুর্ভোগ নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনসহ অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের দাবিতে বরিশাল বিভাগীয় এই বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে ১১ দলীয় ঐক্য।

‘রাজপথ জ্বলে উঠলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে’

সমাবেশে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে সরাসরি অভিযুক্ত করে জামায়াত আমির বলেন, ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর কেয়ারটেকার সরকারের প্রয়োজনীয়তা বিএনপি প্রথমে বুঝতে চায়নি, পরে রাজপথের আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে তা বুঝেছিল। দেশের অপূরণীয় ক্ষতি করার আগেই সরকারকে বাস্তবতা অনুধাবন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা রাজপথে হট্টগোল করতে চাই না, সবাই মিলে দেশ গড়ার কাজে হাত দিতে চাই। কিন্তু আপনারা যেভাবে ধাক্কা দিয়ে আমাদের রাজপথের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, রাজপথ যদি আবার জ্বলে ওঠে, তবে সেই আগুনে অনেক কিছুই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার মাধ্যমে অতীতের পচা ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল। অথচ মেকানিজম করে ক্ষমতায় এসেই সরকারি দল সেই গণভোট ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গেছে এবং মিথ্যাচার করছে।

সংবিধান সংশোধন কমিটি প্রত্যাখ্যান ও ‘ডামি ফ্যাসিবাদ’ মন্তব্য

সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন এবং পরবর্তীতে তার নাম পরিবর্তন করে ‘বিশেষ কমিটি’ করার তীব্র সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান এবং কার্যপ্রণালী বিধির কোথাও কোনো সংসদীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি করার বিধান নেই। এই কমিটিকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দলের বিরোধিতার মুখে সরকার চালাকি করে এর নাম পরিবর্তন করে বিশেষ কমিটি হিসেবে ‘আকিকা’ দিয়েছে। জনগণের সাথে এই ধরনের প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি বন্ধ না করলে সরকারকে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

বিএনপি সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৯ বছর দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, সন্তান ও স্বামী হারিয়েছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নত করেনি। মূল ফ্যাসিবাদকেই জনগণ দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, তাই বর্তমানে সরকারের আচরণে কোনো পরিবর্তন না এলে কিংবা তারা ‘ডামি ফ্যাসিবাদ’ হওয়ার চেষ্টা করলে জনগণ তাদের ছাড় দেবে না। বিশেষ করে বিগত শাসনব্যবস্থার জন্ম দেওয়া ১৩৩টি বিতর্কিত ও দমনমূলক অর্ডিন্যান্স বহাল রেখে বিএনপি জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে তিনি দাবি করেন।

২৪-এর বিপ্লব ও জুলাইয়ের শহীদদের সম্মান জানানোর তাগিদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের গর্ভের ইতিহাস ও সোনালী অংশ। কিন্তু ২৪-এর বিপ্লব ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ৭১-কে টেনে এনে বিতর্ক তৈরি করার কোনো সুযোগ নেই। ৭১ থাকবে তার মর্যাদায়, আর ২৪ থাকবে তার নিজস্ব মর্যাদায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘রক্তে আগুন লেগেছে’ স্লোগান দেওয়া চব্বিশের বীর সেনানী ও তরুণ প্রজন্মের আর কোনো পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা যেন সরকার না করে। ২৪-এর সকল শহীদ ও গাজীদের উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান নিশ্চিত করার জোর তাগিদ দেন তিনি।

বরিশালের এই ঐতিহাসিক বিভাগীয় সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ সারির নেতারা উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া অন্যান্য বিশিষ্ট নেতাদের মধ্যে ছিলেন—

  • লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম)
  • জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম
  • বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক
  • আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু
  • বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান
  • জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান
  • বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী
  • বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন

এ ছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের শীর্ষনেতৃবৃন্দ বিশাল এই সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *