শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মোজাফফর হোসেনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর দেশের প্রচলিত সামরিক বিধি ও সেনা আইন অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যে তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করেছেন যে, দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী একই অপরাধে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুই আইনে বা পৃথকভাবে দুবার বিচার করার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
আজ সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর পিলখানায় অবস্থিত শহীদ ক্যাপ্টেন আশরাফ হলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জওয়ানদের সঙ্গে এক বিশেষ দরবার শেষে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেন।
ভিন্ন পরিচয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে আত্মগোপন ও যেভাবে গ্রেপ্তার
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ১৯৮১ সালের মে মাসে সংঘটিত জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই অভিযুক্ত মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পলাতক ছিলেন। তিনি নিজের আসল নাম-পরিচয় গোপন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ছদ্মপরিচয়ে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে আত্মগোপন করে অবস্থান করছিলেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিবিড় গোয়েন্দা তথ্যের (Intelligence Input) ভিত্তিতে বিশেষ অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যেহেতু তিনি ঘটনার সময় সামরিক বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং ওই মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি, তাই সেনা আইন (Army Act) অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও বিচার সম্পন্ন করার লক্ষ্যে তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে হবে বিচার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সেনাবাহিনীর বিশেষ আদালত বা ‘জেনারেল কোর্ট মার্শাল’-এর (General Court Martial) মাধ্যমে মোজাফফর হোসেনের বিচার প্রক্রিয়া ও দণ্ডাদেশের আইনি দিকগুলো সম্পন্ন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, “বিগত বছরগুলোতে একই হত্যা মামলায় সামরিক আদালতে যাদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং যেসকল আসামির দণ্ড ইতিমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে, সেই ঐতিহাসিক রায়ের আইনি আলোকেই মোজাফফরের বিষয়ে কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা সম্পূর্ণভাবে জেনারেল কোর্ট মার্শাল বিচার বিশ্লেষণ করে বিবেচনা করবে।”
মোজাফফর হোসেনের পলাতক থাকা অবস্থায় তাঁর অন্য কোনো বেসামরিক সহযোগী বা রাজনৈতিক মদদদাতাদের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো ফৌজদারি তদন্ত বা নিয়মিত মামলা দায়ের হতে পারে কি না—সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ও সেনা সদস্যদের অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে ‘মিলিটারি অ্যাক্ট’ বা সেনা আইন প্রযোজ্য হয়। যেহেতু তিনি একই ঐতিহাসিক মামলার একজন পলাতক আসামি ছিলেন, তাই সেনাবাহিনী প্রথমে তাদের নিজস্ব আইন ও বিধি (Army Regulations) অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পরবর্তীতে যদি সিভিল কোর্টে (বেসামরিক আদালত) তাঁর অন্য কোনো সহযোগীর বিরুদ্ধে কোনো আইনি বিষয় প্রযোজ্য হয়, তবে তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হবে।”
সিভিল কোর্টের মামলা ও পুনঃতদন্ত প্রসঙ্গে মন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা
সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক আইনজীবীর পক্ষ থেকে এই হত্যা মামলার পুনঃতদন্ত চেয়ে আদালতে করা একটি বিশেষ আবেদন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “যদি সিভিল কোর্টের আইনি প্রক্রিয়া সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয় বা আবেদন জমা পড়ে থাকে, তবে দেশের প্রচলিত আইনানুগ বিধি অনুযায়ী অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তা পরীক্ষা-রীক্ষা করে দেখা হবে।”
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কর্তৃক অতীতে দীর্ঘ তদন্ত ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন (Final Report) দাখিল থাকা সত্ত্বেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে কোনো বিশেষ পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না—এমন সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আবারও তাঁর পূর্ববর্তী বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—একই ব্যক্তিকে একই অপরাধের জন্য দুই ভিন্ন আইনে বা দুইবার বিচার করা যায় না। ফলে আইনি সীমার মধ্যেই সবকিছু পরিচালিত হবে।”
