শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ‘লং মার্চ টু পার্লামেন্ট’, দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির বিশাল বিক্ষোভ

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত আমূল সংস্কার, দেশজুড়ে জেঁকে বসা প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা কেলেঙ্কারী কঠোরভাবে ঠেকানো এবং বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রাজধানীর ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর থেকে ভারতীয় সংসদ ভবন অভিমুখে ঐতিহাসিক ‘লং মার্চ টু পার্লামেন্ট’ শুরু করেছে নবগঠিত ও তরুণদের আলোড়ন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজিপি)। হাজার হাজার ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী, তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই বিশাল পদযাত্রাটি এরই মধ্যে এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।

গত প্রায় এক মাস ধরে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে সিজিপির সদস্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। আজ সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) দেশটির পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই লং মার্চের আনুষ্ঠানিক ডাক দেওয়া হলে সকাল থেকেই যন্তর মন্তরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মী একত্রিত হন।

পুলিশের ব্যারিকেড ও যন্তর মন্তরের জমকালো পরিবেশ

বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা রোধ করতে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি এড়াতে যন্তর মন্তর ও এর আশপাশের পুরো এলাকায় শত শত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ কড়া ভাষায় জানিয়েছে যে, এই লং মার্চের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে সিজিপি-র পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রশাসনের অনুমতি না থাকলেও তারা পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ পরিকল্পনা অনুযায়ী সংসদ অভিমুখে তাদের পদযাত্রা যেকোনো মূল্যে চালিয়ে যাবেন।

৩০০ বছরের প্রাচীন মানমন্দির যন্তর মন্তরে আজ ভোর থেকেই এক অভূতপূর্ব উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভরা পরিবেশ তৈরি হয়। আন্দোলনকারীরা সরকারবিরোধী ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের পক্ষে একটানা স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতে রয়েছে ভারতের জাতীয় পতাকা, আবার অনেকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে হাতে বহন করছেন শান্তির প্রতীক প্লাস্টিক গোলাপ। সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা রুখতে পুলিশ যন্তর মন্তরের চারপাশে সুবিশাল ও মজবুত ব্যারিকেড তৈরি করেছে। তবে এর মাঝেই সিজিপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা মূল রাস্তার ব্যারিকেডের দিকে এগোতে শুরু করেন। আন্দোলনকারীরা যাতে ব্যারিকেড টপকে কোনো প্রকার সহিংসতায় না জড়ান, সে বিষয়ে সিজিপির স্বেচ্ছাসেবকরা বারবার মাইকে কড়া নির্দেশ দিতে থাকেন।

পার্লামেন্ট অভিমুখী সড়কের শেষ প্রান্তে পুলিশ ভারী ব্যারিকেড বসিয়ে আন্দোলনকারীদের পথ আটকে দেয়। একটি ট্রাকে করে বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব দিতে আসা সিজিপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ও অন্যান্য আন্দোলনকারীদের সেখানেই থামিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যেই সিজিপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে গণমাধ্যমকে জানান যে, চলমান সংকট নিরসনে আলোচনা করার জন্য ভারত সরকার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা বা নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

রোমাঞ্চকর রাত ও সুসংগঠিত প্রস্তুতি

মজার ব্যাপার হলো, এই বিশাল লং মার্চকে সফল করতে গত ২৪ ঘণ্টা ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ছিল দেখার মতো। কোনো রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সংঘাতের চেয়ে এই আন্দোলন যেন ছিল এক সুসংগঠিত মিউজিক ফেস্টিভ্যালের প্রস্তুতি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবকরা জরুরি নির্দেশনা ও নিরাপত্তা টিপস শেয়ার করেছেন।

এর আগে রোববার (১৯ জুলাই) রাতে পুরো যন্তর মন্তর এলাকা যেন একটি অস্থায়ী ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছিল। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা যন্তর মন্তরে পৌঁছে ত্রিপলের নিচে সাধারণ ম্যাট ও পাতলা কম্বল বিছিয়ে রাত কাটান। অনেকেই না ঘুমিয়ে গান গেয়ে, আড্ডা দিয়ে কিংবা সোমবারের মার্চের জন্য বাহারি প্ল্যাকার্ড এঁকে রাত পার করেন। সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্বেচ্ছাসেবকরা আন্দোলনকারীদের মাঝে চা ও প্রাতরাশ বিতরণ করেন।

ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারীদের জন্য কঠোর নিয়মাবলী প্রকাশ করা হয়। সেখানে মিছিল সম্পূর্ণ শান্ত রাখার, শুধু ভারতের জাতীয় পতাকা বহন করার এবং পুলিশের সাথে কোনো প্রকার হাতাহাতি বা তর্কে না জড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে পানির বোতল, ওআরএস স্যালাইন, শুকনো খাবার, পাওয়ার ব্যাংক, ক্যাপ, রেইনকোট ও আরামদায়ক জুতো রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

যেভাবে শুরু সিজিপির

গত মে মাসে অভিজিৎ দীপকে নামের এক তরুণের হাত ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষা সংক্রান্ত জালিয়াতি, দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে একটি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজিপি) বা আরশোলা পার্টির যাত্রা শুরু হয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই তা সাধারণ শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের মাঝে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

উত্তাল ভারতীয় পার্লামেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা

এদিকে বিক্ষোভকারীরা যখন যন্তর মন্তর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে রাস্তায় নেমে অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই ভারতের লোকসভায় (সংসদের নিম্নকক্ষ) চরম হট্টগোল ও হইচই দেখা গেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে বিরোধীরা ত্বরিত আলোচনার দাবি জানালে অধিবেশন দুপুর পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এর আগে অধিবেশন শুরুর মুখে সংসদ ভবনের বাইরে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার বক্তব্যে গত শনিবার ভারতের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রথম কক্ষপথীয় রকেট উৎক্ষেপণের প্রশংসার পাশাপাশি দেশের নতুন তেল শোধনাগার ও সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্টের অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। সংসদ সদস্যদের গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানালেও প্রধানমন্ত্রী মোদীর দীর্ঘ বক্তব্যে পার্লামেন্ট থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর এই বিশাল গণবিক্ষোভ নিয়ে কোনো টু শব্দও করেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *