আ.লীগ ঘনিষ্ঠ থেকে ‘যুবদল নেতা’ পরিচয় দিয়ে দাপট, চাঁদা না দিলেই গুলি

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দলীয় পরিচয় ও খোলস বদলালেও বদলায়নি অপরাধের ধরন ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য। অবশেষে মতিঝিল, আরামবাগ ও কমলাপুর এলাকার ত্রাস, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির ডন তানিম রেজা ওরফে বাপ্পিকে ৩টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গত ১৫ মে দক্ষিণ কমলাপুরের কোরবানির পশুর হাটের ইজারাদার ও ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেনের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং টাকা না দেওয়ায় চার দিনের মাথায় তাঁর কার্যালয়ে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনার তদন্তে এই কুখ্যাত সন্ত্রাসীর নাম বেরিয়ে আসে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই মাসের সাঁড়াশি অভিযানের পর গত ১৭ জুলাই (২০২৬) সকালে রাজধানীর হোটেল পূর্বাণী এলাকা থেকে তানিম রেজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইস্টার্ন কমলাপুর হাউজিংয়ের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৩টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, প্রচুর গুলি, একটি ইলেকট্রিক শক গান ও একটি কুড়াল উদ্ধার করা হয়। এই অভিযানে তানিমের প্রধান সহযোগী ও মাঠপর্যায়ের চাঁদাবাজ রাকিবুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে রিজনসহ (৩৫) মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলেন— মোহাম্মদ জুয়েল (৪৮), শাকিল (২৭) ও মানিক কাজী (৫০)।

যুবলীগ থেকে যুবদল: পরিচয় বদলের চালচিত্র

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে জানান, বিগত নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তানিম রেজা যুবলীগের প্রভাবশালী শীর্ষ নেতাদের হয়ে মতিঝিল এলাকার দরপত্র (টেন্ডার) নিয়ন্ত্রণে মূল অস্ত্র হিসেবে কাজ করতেন। ঠিকাদারদের অস্ত্রের ভয় দেখানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দরপত্র থেকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর মূল কাজ।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলেন তানিম। বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতার ভাইয়ের সঙ্গে সুকৌশলে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে নিজেকে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং আরামবাগ-কমলাপুর এলাকায় নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালান। এই নব্য পরিচয়ে তিনি বাস কাউন্টার, ফুটপাত ও ফ্ল্যাট থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন। কমলাপুরের ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক্সপ্রেস’ বাস কাউন্টার থেকে চাঁদাবাজির পাশাপাশি ঢাকা–কুমিল্লা রুটের ‘রয়েল কোচ’ পরিবহনের একটি বড় অংশের শেয়ার জোরপূর্বক দখলে নিয়ে তিনি পরিবহনের ব্যবসায় নামেন। চাঁদা না দিলে বা তাঁর কথার অবাধ্য হলে তিনি মতিঝিল থানা বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদেরও নিয়মিত ভয়ভীতি ও হুমকি দিতেন বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের হাত ধরে অপরাধজগতে উত্থান

পুলিশের অপরাধ নথি (Crime Dossier) অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ও বর্তমানে দুবাইয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের সহযোগী হিসেবে ২০০২ সালে মতিঝিল এলাকার অপরাধজগতে প্রবেশ করেন এই তানিম রেজা। জিসানের ইশারায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া এবং বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীমের ক্যাডার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাঁদের এই সশস্ত্র তৎপরতার কারণেই খালেদ ও জি কে শামীম দীর্ঘদিন গণপূর্ত অধিদপ্তরের দরপত্র এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, দুবাইয়ে থাকা জিসান এবং আরেক পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ, ইখতিয়ার ও সুব্রত বাইনের নাম আসা বিভিন্ন অপরাধের সাথে এখনো তানিমের গভীর যোগাযোগ রয়েছে।

ভয় দেখানোর মূল হাতিয়ার ‘শুটার বাহিনী’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তানিম রেজা ৭ থেকে ৯ জনের একটি সুসংগঠিত ‘শুটার বাহিনী’ গড়ে তুলেছিলেন, যাদের কাছে অন্তত ৭টি ভারতীয় আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। এই বাহিনীর সদস্য রাকিবুল ইসলাম মাঠপর্যায়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। অন্যদিকে লিখন ও জাহিদ হাসান নামের দুজন সদস্য মতিঝিলের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের তথ্য ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করতেন এবং আদর ও জিতু নামের দুজন শুটার মূলত ভয় দেখাতে গুলি চালানোর দায়িত্ব পালন করতেন। পলাতক এই চার শুটারকে গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে।

দুই পুলিশ কর্মকর্তা হত্যাসহ ৭ মামলার আসামি, ৭ দিনের রিমান্ড

মতিঝিল অঞ্চলের সহকারী কমিশনার হুসাইন মুহাম্মাদ ফারাবী জানান, ২০০৩ সালের ১৫ মে মালিবাগের সানরাইজ আবাসিক হোটেলে একটি বিশেষ অভিযানের সময় ডিবি পুলিশের পরিদর্শক নুরুল আলম শিকদার ও উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন নিহত হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাথেও এই তানিম রেজার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। এ ছাড়া ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে রাজধানীর রামপুরা, হাতিরঝিল, খিলগাঁও, শ্যামপুর ও ডেমরা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দস্যুতা, অপহরণ, হত্যাচেষ্টা ও মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে আরও ৭টি মামলা রয়েছে।

ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেনের কার্যালয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় আদালত তানিম রেজা ও রাকিবুলকে ৭ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এ ছাড়া ফ্ল্যাট থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মতিঝিল থানায় আরেকটি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। মতিঝিলের অপরাধের মূল উৎপাটনে এই চক্রের বাকি সদস্যদের আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *