প্রশাসনে রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত হওয়ার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর: জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার নির্দেশ

জনপ্রত্যাশা পূরণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত থেকে দেশপ্রেম, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সিভিল সার্ভিস হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রধান চালিকাশক্তি। তাই বিগত ১৭ বছরের প্রশাসনিক রাজনীতিকরণের কুৎসিত ও ধ্বংসাত্মক ধারা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে জনপ্রশাসনকে জনগণের প্রকৃত সেবকে রূপান্তরিত করতে হবে।

আজ রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) সকালে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত বিসিএস প্রশাসন একাডেমি মিলনায়তনে ‘জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস-২০২৬’ উপলক্ষ্যে এক বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিসিএস প্রশাসন একাডেমি আয়োজিত “দক্ষ, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন: সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কর্মকৌশল” শীর্ষক চার দিনব্যাপী এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালার উদ্বোধনী দিনে মন্ত্রী এই দিকনির্দেশনা দেন।

‘নিজেদের শাসক মনে না করে জনগণের সেবক ভাবুন’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোঃ এহছানুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি দেশের আপামর জনগণের এক সুউচ্চ ও পবিত্র প্রত্যাশা রয়েছে। আর সেই জনআকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে শতভাগ স্বচ্ছতা ও কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।”

সিভিল সার্ভিসের নবীন ও প্রবীণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “আপনারা এ সমাজের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত একটি অংশ। রাষ্ট্র ও জনগণ আপনাদের পেছনে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করে। তাই মাঠপর্যায়ে নিজেদের কোনোভাবেই শাসক বা জমিদার মনে না করে, জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক কর্মশালা বা উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বাহারি কর্মসূচি প্রণয়ন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই, যদি না তা তৃণমূলের জনগণের প্রকৃত কল্যাণে আসে।

পরিসংখ্যান ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের তাগিদ

দেশে সঠিক ও বাস্তবসম্মত রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নের স্বার্থে জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “বিগত রেজিমের (স্বৈরাচারী সরকারের) সময় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশে দেশের সব ধরনের পরিসংখ্যান ও তথ্যভাণ্ডার সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে দেশের আদমশুমারি, কৃষি উৎপাদন কিংবা পার ক্যাপিটা ইনকাম (মাথাপিছু আয়)—সবখানেই জনগণের সামনে চরম ভুল ও বানোয়াট তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সঠিক নীতি প্রণয়নের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (BBS) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাধীন সংস্থায় রূপান্তরিত করা এখন সময়ের দাবি।

অগ্রাধিকার পাচ্ছে কৃষি, রেমিট্যান্স ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে কৃষি ও রেমিট্যান্স খাতকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজ উৎপাদন ও সংকটে এখনও কৃষি ও মেহনতি কৃষকদের ওপর ভর করেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই আমাদের প্রথাগত কৃষির বাইরে গিয়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ‘এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি’ বা কৃষিনির্ভর শিল্প বিপ্লব গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি, দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে বৈশ্বিক বাজারে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং বা কারিগরি শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। একই সঙ্গে দেশের ক্রমবর্ধমান জন্মহার নিয়ন্ত্রণে স্থবির হয়ে পড়া ফ্যামিলি প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্টকে (পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ) পুনরায় গতিশীল ও সক্রিয় করার বিষয়টি সরকারের গভীর ভাবনায় রয়েছে।

নীতির বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, নীতি বা পলিসি মূলত সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এবং রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের আলোকে প্রণীত হয়। ব্যুরোক্রেসির (আমলাতন্ত্রের) কাজ হলো সেই নীতির আলোকে নির্দিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ, প্রকল্প প্রণয়ন ও আইএমইডি’র (IMED) কঠোর তদারকির মাধ্যমে প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা। তিনি কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে বলেন, “আইন ও নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের পক্ষপাতমূলক কার্যক্রম চালানো যাবে না। নির্বাচিত সরকারের যে নির্বাচনী ইশতেহার এবং ঐতিহাসিক ৩১ দফা অঙ্গীকার রয়েছে, যার ওপর দেশের জনগণের ম্যান্ডেট রয়েছে, তা বিধি মোতাবেক ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন করাই আপনাদের মূল ও পবিত্র দায়িত্ব।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা করেন বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর (সচিব) মোহাম্মদ আলতাফ-উল-আলম এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন অনুষ্ঠানের মুখ্য আলোচক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সিপিটি) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *