রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা পরিচিত প্রশস্ত সড়ক ও পরিকল্পিত নগরজীবনের জন্য। তবে একসময় এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এক ব্লক থেকে অন্য ব্লকে যাতায়াত ছিল বেশ ব্যয়বহুল ও বিড়ম্বনার।
অল্প দূরত্বে রিকশাভাড়া ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হতো। এর সঙ্গে ছিল দরকষাকষির ঝামেলাও। এই পরিস্থিতিতে স্বস্তির বিকল্প হিসেবে যুক্ত হয়েছে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যান ‘বসুন্ধরা বাহন’।
বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোগে চালু হওয়া এই বাহনে তুলনামূলক কম খরচে এক ব্লক থেকে অন্য ব্লকে যাতায়াত করতে পারছেন বাসিন্দারা।
শেয়ার করে চলাচলের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ভাড়া পড়ছে মাত্র ২০ টাকা। এতে যাতায়াতের খরচ কমার পাশাপাশি সময়ও সাশ্রয় হচ্ছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক বাসিন্দা তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘বসুন্ধরাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না।
শুধু কম ভাড়াই নয়, প্রযুক্তির ব্যবহারেও যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।‘বসুন্ধরা গ্রিন সিটি’ অ্যাপের মাধ্যমে এক ক্লিকেই ডেকে নেওয়া যায় বাহন। সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত টানা ১৮ ঘণ্টা এই সেবা চালু থাকে।
সাধারণ প্যাডেলচালিত রিকশার তুলনায় বাহনে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায় বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলে আনা-নেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি বেশ সুবিধাজনক বলে মনে করছেন তারা।
এক বাসিন্দা বলেন, ‘এটি আমাদের অনেক উপকার করেছে। বিশেষ করে বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেওয়া সহজ হয়েছে। খুব সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যায়। এতে সময়ও অনেক সাশ্রয় হচ্ছে।’
অপর এক বাসিন্দা বলেন, রিকশায় যাতায়াত করতে আমাদের খুবই কষ্ট হতো। বিশেষ করে বাচ্চাদের নিয়ে যাতায়াতের সময় অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হতো। বৃষ্টির সময় রিকশায় গেলে ভিজে যাওয়ার কারণে আমার বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ত। তবে এটি হওয়ার পর থেকে আমাদের সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমে গেছে। এখন আমরা এতে যাতায়াত করছি। এতেকরে রোদ-বৃষ্টিতে সমস্যা হচ্ছে না এখন আর।
পরিবেশের দিক থেকেও বাহনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈদ্যুতিক হওয়ায় এতে ধোঁয়া ও শব্দদূষণ নেই। ফলে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার শান্ত পরিবেশ বজায় রাখতেও এটি ভূমিকা রাখছে। একবার চার্জ দিলে বাহন প্রায় ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা চলতে পারে।
বর্তমানে বসুন্ধরার ২০টি ব্লকে মোট ২০৪টি ইলেকট্রিক বাহন চলাচল করছে। চাহিদা বাড়ায় ভবিষ্যতে আরও ৫০০টি বাহন যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আবহাওয়ার প্রতিকূলতার মধ্যেও যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে বাহনে। এর আসন আরামদায়ক এবং গাড়ির উচ্চতা তুলনামূলক কম হওয়ায় বয়স্ক ব্যক্তি, অসুস্থ মানুষ, নারী ও শিশুদের ওঠানামায় সুবিধা হচ্ছে।
বাহনের এক চালক বলেন, ‘বাহনে ওঠানামার সুবিধার জন্য এটি অনেকটাই নিচু করা হয়েছে। আগে রিকশা বা অন্যান্য বাহন তুলনামূলক উঁচু ছিল। ফলে অনেক মানুষের উঠতে কষ্ট হতো। এখন বাহন নিচু হওয়ায় অসুস্থ রোগী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ওঠানামা অনেক সহজ হয়েছে।’
আরেক চালক বলেন, ‘রিকশায় ওঠা-নামায় ঝামেলা আছে। কিন্তু এতে কোনো ঝামেলা নেই। যেকোনো বয়সের মানুষ এতে আরামে বসে যেতে পারেন।’
বাহন শুধু যাত্রীদের যাতায়াতের স্বস্তিই বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে চালকদের কর্মজীবনও। আগে প্যাডেলচালিত রিকশা চালাতেন—এমন অনেক চালক এখন বাহন চালাচ্ছেন।
এক চালক বলেন, ‘আগে রিকশা চালাতাম। পরে বসুন্ধরা কোম্পানি বাহন বের করেছে। এখন বাহন চালাই। বাহন চালিয়ে অনেক খুশি আছি।’
পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন এলাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াত সহজ হয়েছে, অন্যদিকে দুই শতাধিক রিকশাচালক কঠোর শারীরিক শ্রমের পেশা থেকে বেরিয়ে আধুনিক ও তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।
পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরীর জন্য পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় চালু হওয়া ‘বাহন’ স্মার্ট যাতায়াতের একটি নতুন উদাহরণ হয়ে উঠছে।
