‘নেটটা একটু স্লো করে দাও’—কাদের-পলকের ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ হিসেবে দাখিল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রথম দফায় ইন্টারনেটের গতি কমানোর নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি ফোনালাপকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।

রোববার (৯ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ ওই ফোনালাপের কল রেকর্ড দাখিল করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক চলাকালে প্রসিকিউশন এই রেকর্ড উপস্থাপন করে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, সুলতান মাহমুদ ও সহিদুল ইসলাম সরদার। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।

ফোনালাপে ইন্টারনেটের গতি কমানোর নির্দেশ

ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা ফোনালাপে ওবায়দুল কাদেরকে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশ দিতে শোনা যায়।

ফোনালাপে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নেটটা একটু স্লো করে দাও।’

জবাবে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘একটু নেত্রীর পারমিশনটা নিয়ে নিই?’

এরপর ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নিয়ে নাও।’

কথোপকথনের একপর্যায়ে পলক জানান, এ বিষয়ে শেখ হাসিনার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তখন ওবায়দুল কাদের তাকে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে অনুমতি নেওয়ার কথা বলেন।

প্রসিকিউশনের দাবি, এই ফোনালাপ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনায় তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত ফোনালাপ

দাখিল করা কল রেকর্ডের অনুলিপি অনুযায়ী, কথোপকথনটি ছিল—

পলক: ভাই, আসসালামু আলাইকুম। ভাই, আসসালামু আলাইকুম। জি, আসসালামু আলাইকুম ভাই। পলক বলছি।

কাদের: নেটটা একটু স্লো করে দাও।

পলক: জি।

কাদের: ইন্টারনেট।

পলক: একটু নেত্রীর পারমিশনটা নিয়ে নিই?

কাদের: নিয়ে নাও।

পলক: আচ্ছা, ঠিক আছে। জি, আচ্ছা ঠিক আছে।

কাদের: অনেকে আমাকে বলতেছে তো বিষয়গুলো…

পলক: হ্যাঁ, একটু ওই যে মানে বলা আছে তো যে উনি না বললে… মানে…

কাদের: না না, উনাকে জিজ্ঞেস করেই বলবা।

পলক: আচ্ছা, ঠিক আছে। জি। জি স্যার, জি স্যার। জি, আসসালামু আলাইকুম।

প্রসিকিউশন এই কথোপকথনকে মামলার অন্যতম প্রাসঙ্গিক আলামত হিসেবে আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছে।

এর আগে সাদ্দাম-কাদেরের ফোনালাপও দাখিল

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের আরেকটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছিল।

প্রসিকিউশনের দাবি, ওই কথোপকথনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। ফলে দুই ফোনালাপকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।

মামলায় আসামি সাতজন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা এই মামলায় আসামি রয়েছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতা।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

মামলার সব আসামিই বর্তমানে পলাতক বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

তৃতীয় দিনের মতো চলছে যুক্তিতর্ক

এই মামলায় রোববার তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মামলার বিভিন্ন আলামত, সাক্ষ্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে।

ফোনালাপের রেকর্ডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল আলামত উপস্থাপনের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহে আসামিদের ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা করছে প্রসিকিউশন।

তবে আদালতে উপস্থাপিত এসব আলামতের চূড়ান্ত গ্রহণযোগ্যতা, প্রমাণমূল্য এবং আসামিদের দায় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেবেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *