অপরিকল্পিত প্রকল্প ও সিন্ডিকেটের খেসারত দিচ্ছে দেশ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট সমাধানে কাজ চলছে: প্রধানমন্ত্রী

অতীতে অপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নির্দিষ্ট একটি মহলকে সুবিধা দিতে নেওয়া নীতির কারণে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেন, অতীতে জ্বালানি খাতে যেসব অপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল এবং কোনো কোনো মহলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য যেসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, এখন তার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশ, দেশের জনগণ এবং বর্তমান সরকারকে।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দেশকে সচল করার চেষ্টা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় একটি ভঙ্গুর ও দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে দেশকে পুনরায় সচল ও কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতকে শক্তিশালী করতে সরকার বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

তারেক রহমান বলেন, সরকার এমন একটি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিনের সমস্যা জমে ছিল। এসব সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের বর্তমান দুর্ভোগের বিষয়টি অস্বীকার করছে না। অনেক মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছেন—সরকার বিষয়টি জানে।

তিনি বলেন, এই সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নীতি ও কর্মকাণ্ডের প্রভাব রয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা এখনো সক্রিয় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি একটি চক্র অত্যন্ত সুকৌশলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তারা বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য উপস্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে।

তবে সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

অতীতের নীতির খেসারত দিচ্ছে জনগণ

তারেক রহমান বলেন, গ্যাস, জ্বালানি ও পেট্রোলসহ সামগ্রিক জ্বালানি খাতে অতীতে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি মহলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন দেশের মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব অপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও নীতির খেসারত শুধু সরকার নয়, পুরো দেশ ও দেশের জনগণকে বহন করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব সমস্যা চিহ্নিত করে জ্বালানি খাতকে সঠিক পরিকল্পনার আওতায় আনার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতে দেশের প্রয়োজন ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ

চিকিৎসক সমাবেশে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়েও সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও বিস্তৃত করা হবে।

এ ছাড়া যত দ্রুত সম্ভব ই-হেলথ কার্ড চালুর কাজ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে সমন্বয় আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়বে এবং চিকিৎসার জন্য মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।

রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজন

চিকিৎসক সমাবেশে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা বিভিন্ন পেশাজীবী নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সচেতন বা সংগঠিত থাকবেন—এটি অযৌক্তিক নয়।

তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন কারও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেশাগত দায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকলেও তা যেন জনগণের সেবা বা পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

প্রথাগত রাজনীতির বাইরে পরিবর্তনের তাগিদ

তারেক রহমান বলেন, এখন প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। দেশের প্রতিটি খাতে সামগ্রিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বর্তমানে আরও জোরালোভাবে অনুভূত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর দেশের মানুষ রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি অনুভব করছে। রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার স্বাস্থ্য খাতকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সরকারের নেওয়া পরিকল্পনার সুফল যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও মানবিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, চিকিৎসক সমাজ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবেন এবং দেশের মানুষের জন্য উন্নত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দেশকে সচল করার চেষ্টা করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও অর্থনীতিসহ প্রতিটি খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *