এআই দিয়ে প্রথমবার তৈরি কার্যকর নতুন ভাইরাস, চিকিৎসায় সম্ভাবনার পাশাপাশি জৈব নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ইতিহাসে এক নতুন ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের সূচনা হলো। জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন এবং পরীক্ষাগারে সফলভাবে কোষের ভেতরে প্রতিলিপি তৈরি (বংশবিস্তার) করতে সক্ষম ভাইরাস তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবার এআইয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ কোনো ভাইরাসের জটিল জিনোম সফলভাবে নকশা করা সম্ভব হলো।

আন্তর্জাতিক বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ (Science) এই গবেষণার যুগান্তকারী ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার নেপথ্যে ‘Evo1’ ও ‘Evo2’ এবং ই. কোলাই ধ্বংস

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হাই ও পিএইচডি গবেষক স্যামুয়েল কিংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে ‘Evo1’ ও ‘Evo2’ নামের বিশেষ দুটি জেনারেটিভ এআই মডেল। এই মডেলগুলোকে কোটি কোটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ এবং মানুষের জেনেটিক তথ্য বা ডিএনএ সিকুয়েন্স দিয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীতে এআই সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে ‘ব্যাকটেরিওফেজ’ (Bacteria-killing virus) নামের নতুন ভাইরাসের জিনোম নকশা তৈরি করে। জেনারেটিভ এআইয়ের ৩০২টি নকশার মধ্যে পরীক্ষাগারে ৩০২টি আলাদা ভাইরাসের রূপক সংশ্লেষণ করা হলে এর মধ্যে ১৬টি কৃত্রিম ভাইরাস সফলভাবে ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।

এআই ভাইরাস গবেষণার মূল চিত্র ও প্রাপ্ত তথ্য
গবেষক সংস্থা: স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র।
ব্যবহৃত এআই মডেল: Evo1 ও Evo2
তৈরিকৃত ভাইরাসের ধরন: ব্যাকটেরিওফেজ (মানুষের জন্য শতভাগ নিরাপদ)।
সাফল্যের হার: ৩০২টি এআই ডিজাইনের মধ্যে ১৬টি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর।
ভবিষ্যৎ প্রয়োগ: অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী মারাত্মক সংক্রমণের বিকল্প চিকিৎসা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আলো, তবে ঝুঁকিও তৈরি

গবেষকরা জানান, এআই দিয়ে তৈরি এই ভাইরাসগুলো শুধু ই. কোলাই নামের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকেই আক্রমণ করে, মানুষের শরীরের জন্য এগুলো একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত। ভবিষ্যতে যেসব ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করতে পারে (Superbugs), এই এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন ব্যাকটেরিওফেজ তৈরি করে সেই মহামারি ধ্বংস করার এক অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেল।

স্পেনের পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক গুয়েল এবং ম্যানচেস্টার ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির অধ্যাপক প্যাট্রিক কাই এই উদ্ভাবনকে “বিজ্ঞানের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তবে এই সাফল্য কৃত্রিম জীববিজ্ঞানে (Synthetic Biology) নতুন বিতর্ক ও বিশ্ব নিরাপত্তার শঙ্কা উসকে দিয়েছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ সিকিউরিটির গবেষক ড. থমাস ইংলেসবি ও ড. মরিটজ হ্যাঙ্কে সতর্ক করে বলেছেন, অসৎ উদ্দেশ্যে বা ভুল হাতে এই জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার হলে ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর নতুন মারণব্যাধি তৈরি বা জৈব অস্ত্রের (Bioweapon) ব্যাপক ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।

স্ট্যানফোর্ডের গবেষক দল অবশ্য আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, বৈশ্বিক জৈব নিরাপত্তা মেনে কোনো মানব দেহে সংক্রমণে সক্ষম জিনোম এই গবেষণার আওতায় আনা হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *