বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে ঐতিহাসিক বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্ব হস্তান্তরের গোপন ও বিতর্কিত উদ্যোগ ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক তোলপাড়ের মাঝে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চেয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো। সার্বিক প্রক্রিয়ায় গুরুতর ভুল মেনে নিলেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও গভর্নিং বোর্ডের অবিচল সমর্থন পেয়ে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদেই বহাল থাকছেন তিনি।
গতকাল বুধবার (৫ আগস্ট ২০২৬) মরক্কোর রাবাতে অবস্থিত ফিফার আফ্রিকান কার্যালয়ে গভর্নিং বোর্ডের নির্বাহী সদস্যদের নিয়ে এক জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সংস্থাটি ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের আস্থা ও পূর্ণ সমর্থনের কথা নিশ্চিত করেছে।
‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ ও ৪ কোটি ডলারের প্রস্তাব
ঘটনার নেপথ্যে জানা যায়, ইনফান্তিনোর উদ্যোগে ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (FFE) নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপসহ ফিফা পরিচালিত প্রধান টুর্নামেন্টগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বা স্বত্ব বিক্রির একটি গোপনীয় নীল নকশা তৈরি করা হয়েছিল।
এমনকি যেসকল সদস্য রাষ্ট্র বা অ্যাসোসিয়েশন এই প্রস্তাবে নিঃশর্ত সম্মতি জানাবে, তাদের প্রত্যেককে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ৪ কোটি ডলার (প্রায় ৩ কোটি পাউন্ড) করে আর্থিক অনুদান বা প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
দ্য টাইমসে তথ্য ফাঁস, উয়েফার তীব্র প্রতিক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ
গত ২৮ জুলাই যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য টাইমস’-এ এই প্রস্তাবটির বিস্তারিত তথ্য ও গোপনীয় নথি ফাঁস হওয়ার পর বিশ্ব ফুটবলে চরম বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
- উয়েফার চরম হুঁশিয়ারি: ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা উয়েফা (UEFA) সাথে সাথেই কঠোর অবস্থান নেয় এবং প্রকাশ্যেই ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারানোর কথা জানায়। সংস্থাটি এই চুক্তিকে সম্পূর্ণ ‘অস্বচ্ছ, অসাধু ও অনাকাঙ্ক্ষিত চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে।
- ফিফা মহাসচিবের বার্তা: বাইরের সমালোচনার পাশাপাশি ফিফার ভেতর থেকেও নজিরবিহীন প্রতিবাদের সুর ওঠে। সংস্থার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম স্বয়ং মঙ্গলবার কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ দাপ্তরিক চিঠিতে পুরো বিষয়টি ‘একটি দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেন।
দীর্ঘ ৪ ঘণ্টার বৈঠক, ক্ষমা প্রার্থনা ও যৌথ বিবৃতি
তীব্র প্রশাসনিক চাপের মুখে ইনফান্তিনো রাবাতে গভর্নিং বোর্ডের দীর্ঘ ৪ ঘণ্টার এই সংকটকালীন বৈঠক আহ্বান করেন। বৈঠকের পর পরিস্থিতি ইতিবাচক মোড় নেয়।
পরবর্তীতে ফিফার সহ-সভাপতি, কাউন্সিল সদস্য এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো ও মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম পুরো ঘটনাটির জন্য ‘আন্তরিকভাবে ক্ষমা’ চান এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরণের কোনো অস্বচ্ছ উদ্যোগ নেওয়া না হয়, সেই সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
সংস্থার অফিশিয়াল বিবৃতিতে জানানো হয়, ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নীতিগত ‘ভুলগুলো’ স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। তবে কাউন্সিল সদস্য ও আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার বা কোনো তথ্য গোপন রাখার উদ্দেশ্যে এটি করা হয়নি বলে দাবি করা হয়। বৈঠক শেষে রাবাতে চলমান ‘উইমেনস আফ্রিকা কাপ অব নেশনস’-এর একটি ম্যাচ গ্যালারিতে পাশাপাশি বসে উপভোগ করতে দেখা যায় ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রমকে।
একই সঙ্গে ফিফা তাদের বিবৃতিতে কঠোর হুঙ্কার দিয়ে জানিয়েছে যে, এসব ঘটনার অজুহাতে ফিফার ভাবমূর্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর বাইরের কোনো অপপ্রচার আর বরদাশত করা হবে না।
