জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর অভিঘাত সফলভাবে মোকাবিলা করায় বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে একাধিক স্বীকৃতি অর্জন করলেও দেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল এখনো বিশ্বজুড়ে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলে সতর্ক করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, “ক্রমাগত ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম লবণাক্ততার বিস্তার ও উপকূলীয় ভাঙন আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উপকূলের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”
আজ সোমবার (৩ আগস্ট ২০২৬) সকালে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে ‘প্রায়োরিটাইজিং নেচার-বেসড ইন্টারভেনশনস ফর রেজিলিয়েন্ট কোস্টাল বাংলাদেশ’ (Prioritizing Nature-Based Interventions for Resilient Coastal Bangladesh) শীর্ষক জাতীয় কারিগরি কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘ওয়ান হেলথ’ ধারণা ও উপকূলের প্রাণিসম্পদ
কর্মশালায় প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের (Nature-based Solutions) গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “উপকূলীয় সুন্দরবন ও প্রাকৃতির বনাঞ্চল, জলাভূমি, উপকূলীয় উদ্ভিদবেষ্টনী এবং সমন্বিত কৃষি-বনায়ন ব্যবস্থা কেবল পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে না; এগুলো আমাদের প্রাণিসম্পদের প্রাকৃতিক পশুখাদ্যের সহজ প্রাপ্যতা বাড়ায়, প্রাণিস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটায় এবং মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ (One Health) নীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান অনস্বীকার্য। এটি দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কোটিরও বেশি মানুষের প্রাথমিক আয়ের ভিত্তি। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিতে পড়ছে এই দুটি জরুরি খাত।”
উপকূলীয় জীবনযাত্রার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ নিম্নবিত্ত পরিবার তাদের দৈনন্দিন জীবনধারণে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। প্রাণিসম্পদ খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাত্যহিক আয়, পুষ্টির জোগান, কর্মসংস্থান ও পারিবারিক আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অনেক সাধারণ পরিবারের একমাত্র বড় অর্থনৈতিক সম্বল হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের গবাদিপশু।”
৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় উদ্যোগ
সরকারের পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে প্রতিমন্ত্রী টুকু বলেন, “টেকসই প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) পুনরুদ্ধার এবং বাস্তব তথ্য-প্রমাণভিত্তিক কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে সরকার পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্যপূরণে আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় মেগা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা আমাদের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।”
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই কারিগরি কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা ‘কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৌরভ মালহোত্রা।
