আয়নাঘরের দেয়াল ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভয়াবহতার সাক্ষ্য বহন করছে: চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম

বহুল আলোচিত গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর প্রতিটি দেয়াল আজ অব্দি সদ্য অতীত হওয়া শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অমানবিক ভয়াবহতার নীরব সাক্ষ্য বহন করছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, “আয়নাঘর কোনো বানানো রূপকথার গল্প নয়; বরং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম, বর্বর নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সবচেয়ে নির্মম এবং জঘন্য বাস্তবতা। এই গোপন বন্দিশালাই প্রমাণ করে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা ঠিক কতটা ফ্যাসিবাদী ও দেউলিয়া ছিলেন।”

আজ শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাব-১ সদর দপ্তরে অবস্থিত গোপন টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল বা ‘আয়নাঘর’ সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে চিফ প্রসিকিউটর এসব কথা বলেন।

‘ভয়াবহ ভেতরের দৃশ্য, ২৯টি সেলে চলত অমানুষিক নির্যাতন’

গোপন বন্দিশালার বিভীষিকাময় ভেতরের পরিবেশের বিবরণ দিতে গিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “টিএফআই সেলের ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত ভয়াবহ ও আঁতকে ওঠার মতো। আমরা অনুসন্ধানে ছোট-বড় মোট ২৯টি অন্ধকার কামরা বা সেল পেয়েছি। এখানেই আওয়ামী শাসনামলে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিদের বেআইনিভাবে তুলে এনে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর গুম করে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। কাউকে দীর্ঘদিন পর বিভিন্ন সাজানো মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হতো, আবার বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার পর মরদেহ চিরতরে গুম করে ফেলা হতো।”

তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই অন্ধকার কুঠুরি থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচার চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁদের মধ্যে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান অন্যতম। এই অভিযোগের ওপর ভিত্তি করেই টিএফআই সেলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারিক কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।

তবে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “এখন পর্যন্ত বিগত আওয়ামী আমলে গুম ও খুনের শিকার হওয়া অন্তত ২৫০ জনেরও বেশি নিখোঁজ মানুষের আমরা কোনো সন্ধান পাইনি। এই তালিকার মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চোধুরী আলমসহ বহু ভুক্তভোগী রয়েছেন।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকেও রাখা হয়েছিল টিএফআই সেলে

গোপন এই বন্দিশালায় বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকেও দীর্ঘ দিন আটকে রাখা হয়েছিল বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, “তদন্তের তথ্য ও বিভিন্ন সাক্ষীর বর্ণনায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, টিএফআই সেলের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকেও দীর্ঘদিন হাত-চোখ বেঁধে বন্দি রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁকে গোপনে সীমান্ত পার করে ভারতে নিয়ে ফেলে আসা হয়।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়ায় সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি বা উচ্চতর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে যারা মাঠপর্যায়ে এমন অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককেই কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে ট্রাইব্যুনালের এই বিচারকাজ পরিচালিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।”

ট্রাইব্যুনাল বিচারকদের ঐতিহাসিক পরিদর্শনের সময়সূচি

আইনি বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও প্রমাণের সত্যতা যাচাই করতে আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে টিএফআই সেল সরাসরি পরিদর্শন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিশেষ বিচারক দল।

পরিদর্শনকালে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তাঁদের সাথে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ প্রসিকিউশন টিমের সদস্যগণ এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *