বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে এবং বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত বলে মন্তব্য: মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর

বাংলাদেশে দ্রুত রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে এবং দেশটি এখন আমেরিকান বাণিজ্য ও বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের (FDI) জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। তিনি জানিয়েছেন, এ বাস্তবতার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ওপর বহাল থাকা বিদ্যমান ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি ইতিবাচকভাবে সংশোধন করে শিথিল করেছে, যা মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা দেবে।

আজ শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) সকালে তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে মার্কিন বিশেষ দূত এসব কথা বলেন।

ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি শিথিল ও বিনিয়োগের নতুন দুয়ার

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কার্যকর নেতৃত্বে বাংলাদেশে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। ট্রাভেল অ্যাডভাইজরির শিথিলকরণ আমেরিকান বড় বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের বাজার ও আইটি খাতে বিনিয়োগে সরাসরি উৎসাহিত করবে।

বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে আগামী মাসেই ‘ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল’-এর এক উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ছাড়া ঢাকায় মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে খুব শিগগিরই একটি বহুল প্রতীক্ষিত ‘ইউএস ইনভেস্টমেন্ট সামিট’ আয়োজন করার পরিকল্পনার কথা জানান বিশেষ দূত। এ উদ্যোগটি বাস্তবে রূপ দিতে তিনি নিজে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন বলেও প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন।

এফডিএ (FDA), ডিএফসি ও কৃষি-আইটি খাতে যৌথ সহযোগিতা

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও বাণিজ্য নীতি সহজ করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। বিশেষ দূত সার্জিও গর বাংলাদেশে এফডিএর নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সনদ প্রদান কার্যক্রম পুনরায় দ্রুত শুরু করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন করপোরেশনের (DFC) মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত খাতে মার্কিন মূলধন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশে ব্যাপক মার্কিন বেসরকারি বিনিয়োগ বজায় রাখার উদাত্ত আহ্বান জানান।

বাণিজ্য কাঠামোর নতুন দিগন্ত উন্মোচনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ওয়্যারহাউজিং (গুদামজাতকরণ), সয়াবিন, তুলা, গম ও কৃষিপ্রযুক্তি খাতে মার্কিন বিনিয়োগের বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “এসব সম্ভাবনাময় খাতে যুক্ত আমেরিকান প্রযুক্তি ও পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক মানের ও প্রতিযোগিতামূলক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”

তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতের অপার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আইটি অবকাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে আমেরিকার বিশেষ আগ্রহ ও বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। জবাবে সার্জিও গর স্বীকার করেন যে, তরুণদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি দক্ষতায় বাংলাদেশের বিশাল ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আমেরিকার বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও সিলিকন সরবরাহ উদ্যোগ ‘প্যাক্স সিলিকা’ (Pax Silica)-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হওয়ার যোগ্যতা রাখে এবং এ বিষয়ে তিনি নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক ও টেকসই সমাধান

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সংকট ও মানবিক সহায়তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। মার্কিন বিশেষ দূত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, এত বিপুল সংখ্যক মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও সাধারণ জনগণের প্রশংসনীয় অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় আন্তর্জাতিক মোট অনুদানের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ আসে এককভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল থেকে। এই মানবিক সহযোগিতার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বিশেষ দূত সার্জিও গর যোগ করেন, রোহিঙ্গা সংকটের কেবল ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং একটি দ্রুত, স্থায়ী ও রাজনৈতিক সমাধান অত্যন্ত জরুরি। এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে তিনি আসিয়ানের (ASEAN) সদস্য দেশগুলো এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের ওপর জোর দেন।

বৈঠকে উপস্থিত শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ

আজকের এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অর্থবহ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক আরিফুর রহমান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিসটেনসেনসহ মার্কিন দূতাবাস ও সফররত প্রতিনিধিদলের ঊর্ধ্বতন কূটনীতিকরা অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *