ক্লাউড কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে শক্তিশালী ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক পূর্বাভাসের পর শেয়ারবাজারে ঐতিহাসিক এক রেকর্ড গড়েছে বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট (Microsoft)। প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের মাত্র একদিনের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি নিজের বাজারমূল্য (Market Capitalization) প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করে বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতের ইতিহাসে নতুন এক নজির স্থাপন করেছে।
গত গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই ২০২৬) মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেন শেষে মাইক্রোসফটের শেয়ারদর একলাফে ১৫ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। এর ফলে কোম্পানিটির সর্বমোট বাজারমূল্য আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারে।
এনভিডিয়ার রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস
বিশ্বখ্যাত বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এলএসইজি (LSEG)-এর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কর্পোরেট ইতিহাসে এর আগে কোনো একক কোম্পানির ক্ষেত্রে একদিনে এত বিপুল পরিমাণ বাজারমূল্য বৃদ্ধির নজির নেই।
এর আগে গত ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া (Nvidia) একদিনে ৪৪১ বিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য বাড়িয়ে একক দিনে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির আগের রেকর্ডটি ধরে রেখেছিল। বৃহস্পতিবারের অভূতপূর্ব উত্থানের মধ্য দিয়ে এনভিডিয়াকে পেছনে ফেলে সেই বিশ্ব রেকর্ড এখন মাইক্রোসফটের দখলে চলে গেল।
এআই খাতে মেগা বিনিয়োগের ইতিবাচক সুফল
মাইক্রোসফটের সর্বশেষ প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল এবং আগামীর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা ফিরে এসেছে। মূলত এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবন, ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ এবং ‘অ্যাজুর’ (Azure) ক্লাউড অবকাঠামো বিভাগ থেকে আশাব্যঞ্জক মুনাফা অর্জনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বাজারে এই ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
জ্যাকস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বাজার কৌশলবিদ ব্রায়ান মুলবেরি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “মাইক্রোসফট অত্যন্ত চমৎকার ও শক্তিশালী একটি প্রান্তিক পার করেছে। বিশ্ব শেয়ারবাজার যে ধরনের আশাব্যাঞ্জক বার্তা শুনতে চেয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহীরা ঠিক সেটিই উপস্থাপন করেছেন। তাদের এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল ক্লাউড ও এআই বিভাগ।”
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ফলাফল স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির বিকাশে মাইক্রোসফট দীর্ঘদিন ধরে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে আসছিল, তা এখন থেকে বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক সুফল বা ক্যাশ ফ্লো দিতে শুরু করেছে। এর ফলে ডেটা সেন্টার তৈরি ও হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং অবকাঠামোতে অতিরিক্ত মূলধনী ব্যয় নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে কিছুটা আশঙ্কা বা সংশয় ছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে।
মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা
বিশ্ব শেয়ারবাজারে চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকে প্রযুক্ত খাতের জায়ান্ট ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ কোম্পানিগুলোর তুলনায় মাইক্রোসফটের শেয়ারের গতি কিছুটা শ্লথ ছিল। গত বুধবার পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ার দর প্রায় ১৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবারের দুর্দান্ত ফলাফলের পর অন্তত নয়টি আন্তর্জাতিক ব্রোকারেজ হাউস মাইক্রোসফটের শেয়ারের মূল্যায়ন ও লক্ষ্যমূল্য (Target Price) একলাফে বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বাজার বিশ্লেষকদের দেওয়া গড় লক্ষ্যমূল্য ধরা হচ্ছে ৫৬০.৯০ ডলার।
এদিকে মাইক্রোসফট আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজার নিয়ন্ত্রণে তাদের বিনিয়োগের অগ্রযাত্রায় কোনো নেতিবাচক পরিবর্তন আসছে না। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মূলধনী ব্যয় (Capex) ধরা হয়েছে ৫ হাজার কোটি (৫০ বিলিয়ন) ডলার। এছাড়া পুরো ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার বছরের মধ্যে সার্বিক প্রযুক্তি অবকাঠামো খাতে মোট ১,৭৫০ কোটি ডলার ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
বাজার পর্যবেক্ষণ সংস্থা ডিরেকশনের ক্যাপিটাল মার্কেটস বিভাগের প্রধান জেক বেহান পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, “মাইক্রোসফট সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ছিল—কোম্পানিটি এআই খাতে শুধু কতটা ব্যয় করছে তা না দেখিয়ে, সেই বিনিয়োগ থেকে বর্তমানে ঠিক কত টাকা আয় করছে তা বাস্তব তথ্যে দেখাতে পারে কি না। তাদের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রমাণ করছে যে, সেই লক্ষ্য অর্জনে তারা অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে।”
