হবিগঞ্জ জেলা শহরে এনসিপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ দলটির ১০ জন এজাহারনামীয় শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, মারাত্মক মারধর, ভাঙচুর ও দামি মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই ২০২৬) রাত ১০টার দিকে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন রুকন বাদী হয়ে এই সংক্রান্ত এজাহার দাখিল করেন। মামলায় এনসিপির ১০ নেতার নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট ও ছাত্রদলের এজাহার
মামলার লিখিত এজাহার অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে হবিগঞ্জ পৌরসভার কোর্ট মসজিদের সামনে এনসিপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বাদী এজাহারে দাবি করেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জুলাই আন্দোলনের শহীদ রিপন শীলের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং শোকসভায় অংশ নিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কোর্ট মসজিদের সামনে জমায়েত হয়েছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঠিক সেই সময়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, সারজিস আলম, আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও মাহবুবুল বারী চৌধুরীর নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছাত্রদলের শোকসভায় অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় জেলা ছাত্রদল নেতা মাহফুজ চৌধুরী ও মোজাক্কির হোসেন ইমনসহ একাধিক সদস্য লোহার রড, রামদা, ফিকল ও ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে তাঁরা হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
আইফোন ও অর্থ ছিনতাইয়ের অভিনব অভিযোগ
মামলার এজাহারে শারীরিক হামলার পাশাপাশি দামী গ্যাজেট ও নগদ অর্থ ছিনতাইয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। বাদীর দাবি অনুযায়ী, সংঘর্ষ চলাকালে হামলাকারীরা বাদীর একটি আইফোন-১৩, মোজাক্কির হোসেন ইমনের আইফোন-১১, মাহফুজ চৌধুরীর আইফোন-১৪, মাহমুদুল হাসান গাজীর একটি স্যামসাং এস-২২, শিমুল হাসানের একটি আইফোন-১৫ এবং রক্সি ইসলামের কাছ থাকা নগদ ৫০ হাজার টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালে আসামিরা এলাকা ত্যাগ করেন।
মামলায় অভিযুক্ত এনসিপির ১০ নেতা:
১. নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী — কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক, এনসিপি
২. সারজিস আলম — মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল), এনসিপি
৩. নুর আলম চৌধুরী — আহ্বায়ক, হবিগঞ্জ জেলা জাতীয় শক্তি
৪. ফখরুল জাকির — সদস্য, হবিগঞ্জ জেলা কমিটি
৫. আ. হাই কামাল — সদস্য, হবিগঞ্জ জেলা কমিটি
৬. রুহাম গাজী — সদস্য, হবিগঞ্জ জেলা কমিটি
৭. মাহবুবুল বারী চৌধুরী মুবিন — সদস্য সচিব, হবিগঞ্জ জেলা কমিটি
৮. নাহিদ উদ্দিন তারেক — কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক, এনসিপি
৯. আবু হেনা মোস্তফা কামাল — জেলা আহ্বায়ক, এনসিপি
১০. ওয়াদুদ মাহমুদ চৌধুরী — সদস্য, জেলা কমিটি
এনসিপির পাল্টা অভিযোগ ও পুলিশের অবস্থান
একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এনসিপির পক্ষ থেকেও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে সশস্র হামলার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এনসিপি নেতাদের দাবি, গত ২৮ জুলাই পদযাত্রা ও পথসভা শেষে সার্কিট হাউসে ফেরার পথে ছাত্রদলের হামলায় সারজিস আলমসহ এনসিপির অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হন। এ সময় এনসিপির এক কর্মীর একটি চোখ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হলে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী ও সারজিস আলম সোনালী ব্যাংকে আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে পুলিশি পাহারায় মৌলভীবাজার পৌঁছান।
মামলা দায়েরের বিষয়ে জানতে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হকের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ধ্রুবেশ চক্রবর্তী ছাত্রদল নেতার বাদী হয়ে মামলা করার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. জিল্লুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাহবুব আহমেদও মামলা প্রক্রিয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। জাতীয় রাজনীতিতে তরুণ নেতাদের বিরুদ্ধে এই মামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
