যশোরে গ্রেপ্তার চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমন’, চাঁদাবাজি ও হামলার মামলায় বড় অগ্রগতি

চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে হামলার মূল হোতা শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৩টার দিকে যশোরের ধুমধুমপুর এলাকা থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

যশোরের পুলিশ সুপার (SP) সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে জানান:

“গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একটি চৌকস দল যৌথভাবে ধুমধুমপুর এলাকায় বিশেষ চেকপোস্ট বসায়। চেকপোস্টে তল্লাশিকালে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

সাধারণ জীবন থেকে দুবাই সাজ্জাদের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’

গ্রেপ্তারকৃত ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। জানা যায়, ফটিকছড়িতে তাঁর জীবনযাপন আর দশটা সাধারণ যুবকের মতোই ছিল। তবে দুবাইপ্রবাসী চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেনের অপরাধ চক্রে যোগ দেওয়ার পরেই তাঁর জীবন অপরাধ জগতে মোড় নেয়।

অল্প দিনেই চট্টগ্রামে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, কুপিয়ে জখম ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বিদেশি পিস্তল হাতে তাঁর একাধিক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। ধীরে ধীরে তিনি দুবাইপ্রবাসী সাজ্জাদ বাহিনীর ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে চট্টগ্রামে নিজের আধিপত্য কায়েম করেন।

অভিযোগ রয়েছে, দুবাই থেকে ফোনে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও স্বনামধন্য শিল্পপতিদের কাছে অঢেল চাঁদা দাবি করতেন ইমন। তাঁর চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বসতবাড়িতে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি বর্ষণ ও অস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটানো হতো।

চকবাজারে ডিডিএন কার্যালয়ে তাণ্ডব ও ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে চট্টগ্রামের চকবাজারের বিখ্যাত ‘ডিডিএন’ (DDN) ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়।

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত ১৩ জুলাই চন্দনপুরা এক্সেস রোডের মরিয়ম হাইটস ভবনের ডিডিএন কার্যালয়ে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ত্রাসী দলটি হেলমেট পরে রামদা, ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অফিসে ঢুকে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও আসবাবপত্র কুপিয়ে তছনছ করে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করে। এ সময় কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।

এই তাণ্ডবের পর ফেসবুকে এক অডিও বার্তায় ডেভিড ইমন প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন—তারা সাধারণ ছুরি বা কিরিচ দিয়ে হামলা চালান না; তাঁদের হামলার ভয়াবহ রূপ কেমন, তা চট্টগ্রামবাসী ভালো করেই জানে!

ব্যাপক অভিযানে গ্রেপ্তার ও আইনি প্রক্রিয়া

চকবাজারের ডিডিএন কার্যালয়ে তাণ্ডবের ঘটনায় মামলা দায়ের হলে পুলিশ ও র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) যৌথ অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যে ঘটনার সাথে জড়িত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করে।

এর আগে সিএমপির (CMP) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সল আহম্মেদ জানিয়েছিলেন, ডেভিড ইমনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্তের কাজ চলছে। অবশেষে যশোর পুলিশের সহায়তায় ধুমধুমপুরে চেকপোস্ট বসিয়ে এই কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে জালে তুলতে সক্ষম হয় যৌথ দল। তাঁর গ্রেপ্তারের খবরে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *