জয়পুরহাটে কর্মরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিসিএস ৩৪তম ব্যাচ) মো. আরিফ হোসেনের বিরুদ্ধে যৌতুক দাবি, একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, শারীরিক নির্যাতন এবং কর্মস্থলের প্রভাব খাটিয়ে স্ত্রীকে মিথ্যা মামলায় হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
রবিবার (২৬ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরেন তাঁর স্ত্রী শামিয়া খান এশা।
বিয়ের উপহার, যৌতুক ও নির্যাতনের সূচনা
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এশা জানান, ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী আরিফ হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময় তাঁর পরিবার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার আসবাবপত্র, ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার, হীরার আংটি ও মূল্যবান ঘড়ি উপহার হিসেবে প্রদান করে।
বিয়ের কিছু দিন যেতে না যেতেই আরিফের আচরণে ভয়াবহ পরিবর্তন লক্ষ্য করেন তিনি। এশার অভিযোগ, তাঁর স্বামী নিয়মিত মদ্যপান, মাদক সেবন এবং বিভিন্ন নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এমনকি তাঁর অনুপস্থিতিতে বাসায় অন্য নারী এনে সময় কাটানো এবং বন্ধুমহল নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রতিবাদ করায় তাঁকে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
৪০ লাখ টাকা যৌতুক আদায় ও নতুন দাবি
সংবাদ সম্মেলনে এশা অভিযোগ করে বলেন, সংসার বাঁচানোর তাগিদে তাঁর পরিবার থেকে প্রথম দফায় ৪০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। এশার বাবা-মা গ্রামের জমি বিক্রি করে নগদ অর্থ ও ব্যাংক চেকের মাধ্যমে ওই টাকা পরিশোধ করেন। সেই টাকা দিয়েই পরবর্তীতে গাড়ি ও পূর্বাচলে জমি কেনেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা।
তবে এতেও ক্ষান্ত না হয়ে পরবর্তীতে আরও ৫০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন আরিফ। যৌতুক না পেয়ে ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি জয়পুরহাটের বাসা থেকে তাঁর সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী শিশু কন্যাসহ মা-মেয়েকে বেধড়ক মারধর করে গভীর রাতে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে পুলিশি নিরাপত্তায় কিছুদিন থাকতে হয় তাঁকে।
অনৈতিক অবস্থায় হাতেনাতে ধরে রক্তাক্ত ও সিআর মামলা
এশা আরও জানান, গত ৩০ মে ঢাকার বসিলার একটি বাসায় স্বামীকে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পেয়ে প্রতিবাদ করলে আরিফ তাঁর মাথায় মোবাইল ফোন দিয়ে বেধড়ক আঘাত করেন। এতে তিনি রক্তাক্ত ও অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরপর এসব নির্যাতনের ঘটনার পর তিনি আইজিপি, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এবং জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ জানান। পরবর্তীতে গত ৫ জুলাই ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় একটি সিআর (CR) মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা আরিফ হোসেনের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন।
পাল্টা মিথ্যা মামলা ও এসিড মারার হুমকি: প্রত্যাহারের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে এশা অভিযোগ করেন, আদালতের সমন পেয়ে আরিফ হোসেন নিজের পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করে জয়পুরহাট সদর থানায় এশা ও তাঁর বাবা-মাসহ পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেন। একই সঙ্গে মামলার সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং এশার মুখ এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
এশা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“একজন কর্মরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে তিনি জয়পুরহাট জেলাতেই দায়িত্বে বহাল থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে সাক্ষীদের ভয় দেখাচ্ছেন। আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও বিচার বিভাগের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি—সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁকে অবিলম্বে জয়পুরহাট থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হোক।”
এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এই নারী।
