২০১৩ সালের শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ: শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা

বিগত ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সমাবেশে ইতিহাসের নৃশংসতম যৌথ সামরিক-বেসামরিক ও পুলিশি হত্যাযজ্ঞের ঘটনার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তদন্ত প্রতিবেদন অবশেষে প্রসিকিউশনের হস্তগত হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদসহ তৎকালীন সরকারের নীতি-নির্ধারক ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

আজ রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে এই আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম প্রতিবেদন প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

২১ জুলাই ট্রাইব্যুনালে দাখিল, পর্যালোচনায় প্রসিকিউশন

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, “তদন্ত সংস্থা অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদি তদন্ত শেষে আজ সকালে তাদের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের প্রসিকিউশন টিমের কাছে জমা দিয়েছে। বর্তমানে আমাদের প্রসিকিউটররা এই বিশাল ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনটির আইনি ও টেকনিক্যাল পর্যালোচনার (Scrutiny) কাজ করছেন। আগামী ২১ জুলাই (২০২৬) নির্ধারিত আইনি সময়সীমার মধ্যেই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হবে।”

তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার আসামির তালিকায় শেখ হাসিনা ও জেনারেল আজিজ আহমেদ ছাড়াও তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং বিতর্কিত কয়েকজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবী রয়েছেন। বিশেষ করে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু, বেসরকারি টেলিভিশনটির সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপা এবং বিতর্কিত লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের নাম আসামির তালিকায় অর্ন্তভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে মধ্যরাতে পরিচালিত ‘অপারেশন সিকিউর ঢাকা’ বা শাপলা চত্বর ক্র্যাকডাউনের মাঠপর্যায়ের নির্দেশদাতা তৎকালীন পুলিশ প্রধান (আইজিপি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ ৪১ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই চরম মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি হয়েছেন।

চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে হেফাজত নেতাদের উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ

এদিকে, শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের মামলার তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি ও আসামিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে আজ রোববার সকালেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আসেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ১০ থেকে ১৫ জনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।

সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমির আল্লামা আব্দুল হামিদের (মধুপুরের পীর সাহেব) নেতৃত্বে এই প্রতিনিধি দলটি চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন— হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিসসহ দলটির শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। বৈঠক শেষে হেফাজত নেতারা শাপলা চত্বরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা শেখ হাসিনাসহ সকল আসামির দ্রুত আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ গ্রেপ্তার এবং সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: উল্লেখ্য, বিগত ২০১৩ সালের ৫ মে ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর শানে কটূক্তিকারীদের শাস্তি এবং বিতর্কিত শিক্ষা কারিকুলাম সংশোধনসহ ঐতিহাসিক ১৩ দফা দাবিতে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি ও সমাবেশ আহ্বান করেছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। দিনভর ঢাকা ও এর প্রবেশমুখগুলোতে তীব্র উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পর গভীর রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে পুলিশ, র‌্যাব এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) একযোগে যৌথ সাঁড়াশি অভিযান ও ক্র্যাকডাউন চালিয়ে শাপলা চত্বর খালি করে। ওই রাতের অভিযানে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহুসংখ্যক মানুষকে হত্যা ও গুম করার গুরুতর অভিযোগে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই বিশেষ তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *